এআই কি আসলেই সুর তৈরি করতে পারে?

বিকেলের অবসর সময়ে প্রিয় কোনো সুরের মূর্ছনায় ডুবে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই আছে। কখনো ভেবে দেখেছেন কি, যে গানটি শুনে আপনার মন ভালো হয়ে যায়, তার পেছনে কোনো মানুষের হাতের ছোঁয়া নেই? হয়তো সম্পূর্ণ গানটি তৈরি হয়েছে কোনো একটি মেমোরি চিপ এবং গাণিতিক কোডের মাধ্যমে। শুনতে কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও, জেনারেটিভ অডিও এআই প্রযুক্তির কল্যাণে এটি এখন বাস্তব। হঠাৎ যদি জানতে পারেন, যে সুরটা শুনে আপনার মন ভালো হয়ে গেল, যে গানের কথাগুলো আপনাকে ছুঁয়ে গেল, তার কোনোটিই কোনো মানুষ লেখেনি। পুরো গানটি বানিয়েছে একটা মেমোরি চিপ আর কিছু গাণিতিক কোড। কথাটা শুনে কেমন একটু খটকা লাগছে, তাই না। একটু গভীরভাবে ভাবলেই বুঝবেন, ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়।

আমরা এতদিন বিশ্বাস করে এসেছি, শিল্প-সংস্কৃতি বা সুর সৃষ্টির মতো বিষয়গুলো একান্তই মানুষের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিচ্ছে। বর্তমানে ‘সুনো’ কিংবা ‘উদোর’ মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যেকোনো মানুষ খুব সহজে মিউজিক তৈরি করতে পারছেন। আপনি কেবল আপনার চাহিদার কথা লিখে দেবেন—যেমন বৃষ্টির দিনে বিষণ্ন কোনো সুর কিংবা গিটার ও বাঁশির মেলোডি—আর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এআই আপনার জন্য একটি সম্পূর্ণ গান তৈরি করে দেবে। সেই গানে শুধু সুর নয়, থাকবে কথার গাঁথুনি, তালের বিন্যাস এবং এমনকি কোনো কাল্পনিক গায়কের নিপুণ গায়কীও। একজন মানুষ যেভাবে গানে দম নেয় বা কণ্ঠের সূক্ষ্ম কারুকাজ ফুটিয়ে তোলে, এআই এখন তা-ও অনুকরণ করতে সক্ষম। আমরা এত দিন ধরে জেনে এসেছি, ছবি আঁকা, গল্প লেখা কিংবা সুর বাঁধার মতো কাজগুলো কেবলই মানুষের অনুভূতির প্রকাশ। কিন্তু গত কয়েক মাসে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে এমন এক বিপ্লব এসেছে, যা আমাদের এই পুরোনো ধারণাকে বড়সড় ধাক্কা দিচ্ছে। আপনি ল্যাপটপে শুধু লিখলেন—‘বৃষ্টির দিনের বিষণ্নতা নিয়ে একটা মেলোডিয়াস বাংলা গান বানিয়ে দাও, যেখানে অ্যাকোস্টিক গিটার আর বাঁশির সুর থাকবে। সুরের মধ্যে কোথায় গায়ক একটু দম নেবে, কোথায় গলা একটু কাঁপবে—সবকিছুই এআই ফুটিয়ে তোলে একেবারে আসল মানুষের মতো।

এআই কীভাবে এই অসাধ্য সাধন করে?

মূলত এটি কাজ করে প্যাটার্ন শনাক্তকরণ ও গণিতের ওপর ভিত্তি করে। একে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বিশ্বের অগণিত গান ব্যবহার করা হয়েছে। নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এআই বিশ্লেষণ করেছে যে, একটি মেলোডির পর কোন নোটটি বসালে তা শ্রুতিমধুর হয় বা দুঃখের গানে ড্রামসের বিট কেমন হওয়া উচিত। প্রযুক্তিবিদরা এখন এটি নিয়ে নতুন নতুন পরীক্ষা চালাচ্ছেন। তবে এই প্রযুক্তি নিয়ে সতর্কবার্তাও রয়েছে। এমআইটি টেকনোলজি রিভিউর তথ্যমতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল ব্যবহারের ফলে একশ কোটি মানুষের মৃত্যুঝুঁকির মতো বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল বা অ্যালগরিদমের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং ভুল থেকে শেখার প্রক্রিয়ার মতো বিষয়গুলো প্রযুক্তি বিশ্বকে প্রতিনিয়ত ভাবিয়ে তুলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মৃত্যু হতে পারে ১০০ কোটি মানুষের, সতর্ক করলেন বিল গেটস। এর উত্তর লুকিয়ে আছে গণিত ও প্যাটার্ন চেনার ক্ষমতায়।

বিশ্বজুড়ে এখন বড় বড় শিল্পী ও গবেষকদের মনে প্রশ্ন জেগেছে—এআই যদি যন্ত্রের সাহায্যে মুহূর্তেই সুর তৈরি করতে পারে, তবে কি মানুষের তৈরি গানের কদর হারিয়ে যাবে? আসলে এআই বিপুল পরিমাণ ডেটা থেকে গান সাজাতে পারলেও, এর পেছনে কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা বা আবেগ নেই। মানুষের গান তৈরির পেছনে থাকে জীবনের গল্প, প্রেম, বিচ্ছেদ কিংবা সংগ্রামের অভিজ্ঞতা, যা কোনো অ্যালগরিদম হুবহু নকল করতে পারে না।

বর্তমানে অনেক তরুণ সুরকার এআইকে প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে বরং সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করছেন। সৃজনশীল আইডিয়া আসার পর তারা এআইয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক খসড়া বা ডেমো তৈরি করে নিচ্ছেন এবং পরবর্তীতে নিজের মেধা দিয়ে তাতে প্রাণ ঢালছেন। প্রযুক্তি আমাদের কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে দিলেও, গানকে হৃদয়স্পর্শী করার মূল চাবিকাঠি কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতেই থাকছে। যন্ত্র কেবল সুরের কাঠামো দিতে পারে, কিন্তু সেই সুরে আবেগ আর অনুভূতি মিশিয়ে শ্রোতার হৃদয় জয় করার কাজটি মানুষই করবে। আজকের গল্পটা এআইয়ের সেই নতুন মিউজিক্যাল জাদু নিয়েই।