বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানির স্বপ্ন বাস্তবায়নে দক্ষ জনবল ও কম খরচের পাশাপাশি এখন গুণগত মান বজায় রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সফটওয়্যার কোয়ালিটির ক্ষেত্রে উল্টোভাবে ভাবতে হবে।
বিশ্ববাজারে একজন আন্তর্জাতিক ক্রেতা কেবল কোড কেনেন না, বরং তারা পণ্যের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্যতার ওপর আস্থা রাখেন। একজন আন্তর্জাতিক ক্রেতা শুধু কোড কেনেন না; তিনি আসলে আস্থা কেনেন—সফটওয়্যারটি ঠিকমতো কাজ করবে কি না, ব্যবহারকারী বাড়লে টিকে থাকবে কি না, নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করবে কি না, নতুন সংস্করণে পুরোনো ফিচার ভেঙে যাবে কি না এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে মান বজায়। আর আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থার সরাসরি আর্থিক মূল্য আছে। এর মূল্য শুধু সার্টিফিকেটে নয়, আসল মূল্য হচ্ছে বাংলাদেশের একজন পেশাজীবীর দক্ষতাকে এমন একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মাপা, যা বিদেশি নিয়োগকর্তা ও ক্রেতার কাছে পরিচিত। দেখতে হবে—কতজন চাকরি পেয়েছেন, কতজন আন্তর্জাতিক প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন এবং কত বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ফলে সফটওয়্যার তৈরির গতি বহুগুণ বেড়ে গেছে। দক্ষ জনবল, তুলনামূলক কম খরচ, আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ এবং সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সবই সেই আলোচনায় আছে।
কোড লেখা থেকে শুরু করে ত্রুটি শনাক্তকরণ বা টেস্ট কেস তৈরির মতো কাজগুলো এখন এআইয়ের সহায়তায় দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে, যা একটি উন্নয়ন দলকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ফিচার সরবরাহের সক্ষমতা দিচ্ছে।
তবে এই দ্রুতগতির বিপরীতে নতুন একটি সংকট তৈরি হয়েছে।
কোড তৈরির হারের সঙ্গে যদি মান যাচাই, নিরাপত্তা পরীক্ষা ও নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষার গতি তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তবে সফটওয়্যার সরবরাহ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
এআই দ্রুত কোড লিখতে পারলেও তার যথার্থতা, রক্ষণাবেক্ষণযোগ্যতা এবং ব্যবসায়িক লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষার বিষয়টি এখনো মানবিক বিচারবোধ ও কাঠামোগত পরীক্ষার ওপরই নির্ভরশীল। এটি এখনো কোনো সর্বজনীন শিল্পমান নয়।
ভবিষ্যতে ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, টেলিযোগাযোগ ও সরকারি ডিজিটাল সেবার মতো ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে ডেভেলপার ও কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ারের অনুপাত ১:১-এর কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এ কারণেই ভবিষ্যতে ডেভেলপার ও টেস্টারের সম্পর্কও বদলাবে। ব্যাংকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট, টেলিকম, ই-কমার্স, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, করব্যবস্থা, লজিস্টিকস ও সরকারি সেবা—সবই ক্রমে সফটওয়্যারনির্ভর।
এআই প্রযুক্তির যুগে সফটওয়্যার টেস্টিংয়ের ক্ষেত্রটিও পরিবর্তিত হচ্ছে। একদিকে এআই ব্যবহার করে টেস্ট অটোমেশন ও ত্রুটি পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে এআই ব্যবস্থার নিজস্ব নির্ভুলতা, পক্ষপাতহীনতা ও নিরাপত্তাও পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের তথ্য ও প্রযুক্তি সেবা রপ্তানি ছিল প্রায় ৭২ কোটি ৪৬ লাখ মার্কিন ডলার। এর প্রায় ৮৭ শতাংশ এসেছে কম্পিউটার সেবা থেকে, যার মধ্যে সফটওয়্যার উন্নয়ন ও আউটসোর্সিং অন্তর্ভুক্ত। এই আয় ৫০০ কোটি ডলারের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের তুলনায় অনেক কম, যা আমাদের দক্ষতায় ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয়। বহু বছর ধরে আলোচিত ৫০০ কোটি ডলারের উচ্চাকাঙ্ক্ষার তুলনায় এই অর্জন এখনো অনেক কম। আইএসটিকিউবিএর নিজস্ব তালিকাতেও বিএসটিবিকে বাংলাদেশের মেম্বার বোর্ড হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সফটওয়্যার কোয়ালিটি নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন বাজার ধরতে পারে। শুধু পূর্ণাঙ্গ সফটওয়্যার নয়, বরং বিদেশে তৈরি সফটওয়্যারের টেস্টিং বা মান যাচাইয়ের মতো সেবা রপ্তানি করেও আয়ের পথ তৈরি হতে পারে। এই পেশায় আন্তর্জাতিক মান অর্জনের জন্য ইন্টারন্যাশনাল সফটওয়্যার টেস্টিং কোয়ালিফিকেশনস বোর্ড বা আইএসটিকিউবি-এর মতো স্বীকৃত ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ১৫ লাখ পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে এবং ১১ লাখের বেশি পেশাজীবীকে সার্টিফিকেশন দেওয়া হয়েছে, যার কার্যক্রম ১৩০টিরও বেশি দেশে বিস্তৃত। এটি টাকা আটকে দিতে পারে, সেবা বন্ধ করতে পারে, তথ্য ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, একটি প্রতিষ্ঠানকে গ্রাহক হারাতে বাধ্য করতে পারে কিংবা আন্তর্জাতিক ক্রেতার আস্থা নষ্ট করতে পারে। সঠিক পথ হওয়া উচিত—শেখা, হাতে-কলমে কাজ মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক প্রকল্প থেকে রপ্তানি আয়।
বাংলাদেশে ২০০৬ সাল থেকে বাংলাদেশ সফটওয়্যার টেস্টিং বোর্ড (বিএসটিবি) আইএসটিকিউবি সদস্য পর্ষদ হিসেবে কাজ করে আসছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার সার্টিফায়েড টেস্ট ইঞ্জিনিয়ার তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে বিএসটিবি। তবে এই লক্ষ্যকে কেবল ১০ হাজার সার্টিফিকেটের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে একে কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভিত গড়তে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাক্রমে সফটওয়্যার টেস্টিং, নিরাপত্তা ও এআই অ্যাস্যুরেন্সকে কাঠামোবদ্ধভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এআই ডেভেলপারের প্রয়োজন কমাবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। ফাংশনাল টেস্টিং, টেস্ট অটোমেশন, এপিআই টেস্টিং, পারফরম্যান্স টেস্টিং, নিরাপত্তা পরীক্ষা, মোবাইল টেস্টিং, অ্যাক্সেসিবিলিটি টেস্টিং, এআই/মেশিন লার্নিং যাচাই, ডেটা কোয়ালিটি ও ম্যানেজড কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স—এসব সেবাই আন্তর্জাতিকভাবে দূর থেকে দেওয়া যায়। ১০ হাজার পেশাজীবী—কিন্তু ১০ হাজার সার্টিফিকেট নয়। বিএসটিবি বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত ও সরকারি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলছে। বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই আগে প্রশিক্ষণ দিই, পরে বাজার খুঁজি।
আগামী ৫ ডিসেম্বর ঢাকার শেরাটন হোটেলে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চতুর্থ এসকিউএটি বাংলাদেশ সিম্পাজিয়াম, প্রশ্নোত্তর ও টেস্টিং। ‘কোয়ালিটি ইন অ্যাজ অব এআই’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত এই সম্মেলনে আইএসটিকিউবির গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া ডুসা–জিগারসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন। এটি কেবল একটি প্রযুক্তি সম্মেলন নয়, বরং নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা, শিক্ষক ও পেশাজীবীদের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরির একটি সুযোগ। দিনশেষে সফটওয়্যার রপ্তানির লড়াই কেবল কোডের পরিমাণের ওপর নয়, বরং মান ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর নির্ভর করছে। অন্যদিকে আছে এআইকে টেস্টিং—একটি এআই–ব্যবস্থা কতটা নির্ভুল, নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ, পক্ষপাতমুক্ত ও দায়িত্বশীল আচরণ করছে, সেটি যাচাই করা; অর্থাৎ আগামী দিনের টেস্টার শুধু ‘বাগ খোঁজার মানুষ’ নন। ক্রেতারা কেন বাংলাদেশকে বেছে নেবেন। অন্যদিকে কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ারিং নিজেই একটি রপ্তানিযোগ্য পেশাগত সেবায় পরিণত করবে।

