সংযুক্ত আরব আমিরাতের ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে গিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়। বিদেশের মাটিতে টানা ব্যর্থতার এই বৃত্তে আটকা পড়া দলের ব্যাটারদের কেবল কারিগরি ত্রুটি নয়, বরং মানসিক জড়তা ও সাহসের অভাবকেই বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। হৃদয় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, মাঠের লড়াইয়ে সাহসী পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় দলের ব্যাটিং লাইনআপ বারবার ভেঙে পড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে ব্যর্থতার এক তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ। বিদেশের মাটিতে জাতীয় দলের এমন আবেগজনক ও ভঙ্গুর পারফরম্যান্সের পর কোনোরকম অজুহাত না দেখিয়ে মূল সমস্যার দিকে আঙুল তুলেছেন সহ-অধিনায়ক ও ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়। আমাদের ব্যাটিং ইউনিট পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
টুর্নামেন্টের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল অত্যন্ত নাজুক। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে দল ১৭২ রানে গুটিয়ে যায়, ফলে ৯৯ রানের বিশাল ব্যবধানে হার মানতে হয়। সেই ম্যাচে একপর্যায়ে ১২৯ রানেই ৭ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। আফগানিস্তানের বিপক্ষে পরের ম্যাচটি ছিল আরও হতাশাজনক; মাত্র ২৮ রানে ৪ উইকেট হারানো দলটি শেষপর্যন্ত ১৬০ রানে অলআউট হয়ে যায়। আফগানরা সেই লক্ষ্য অনায়াসেই ৮৭ বল হাতে রেখে ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে লিগ পর্বের ম্যাচগুলোতে দলের ব্যাটিং লাইনআপের চরম ধস টাইগারদের ফাইনালের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। এক পর্যায়ে ১২৯ রানেই সাত উইকেট হারিয়ে ব্যাকফুটে চলে যায় দল।
সংবাদ সম্মেলনে তাওহিদ হৃদয় অকপটে স্বীকার করেন যে, শেষ দুটি ম্যাচে ব্যাটাররা প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে পারেনি এবং এর দায় পুরো দলের। তার মতে, ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তানের মতো বড় দলকে হারানোর দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশের কন্ডিশনে বাংলাদেশ একই ছন্দ ধরে রাখতে পারছে না। ২০২৩ সালের মে মাসে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর থেকে বিদেশের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজ জয় অধরা রয়ে গেছে টাইগারদের। হৃদয় জানান, এই পার্থক্যটাই নির্দেশ করে যে বিদেশের কন্ডিশনে ব্যাটারদের উন্নতির অনেক জায়গা রয়েছে। দেশের বাইরে আমরা নিয়মিত ভালো করতে পারছি না; অথচ ঘরের মাঠে একাধিক সিরিজ বেশ আধিপত্য বজায় রেখে জিতেছি। আমি মনে করি এখানে আমাদের অনেক উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে।
দলের ব্যাটিং ইউনিটের এই ভঙ্গুর অবস্থার পেছনে হৃদয় খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে পিছিয়ে থাকাকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে নেওয়াটা জরুরি, কিন্তু রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সফল হওয়া কঠিন। দলের ওপর যখন চাপ তৈরি হয়, তখন উইকেট বিলিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তিনি মনে করেন, একজন খেলোয়াড় বা দুইজনের দায়িত্ব নেওয়ার সাহস দেখালে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কঠিন সময়ে হাল ধরার মতো একজন বা দুজন ক্রিকেটারের বড়ই অভাব অনুভব করছেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকতে হলে মানসিকতায় যে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন তিনি, ‘সমস্যাটি আসলে মানসিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দলে এ মুহূর্তে সে ধরনের পারফরমারের অভাব দৃশ্যমান।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে ঘরের মাঠে খেলা ৯টি ওয়ানডের মধ্যে ৬টিতেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ, সেখানে দেশের বাইরের ম্যাচগুলোতে জয়ের হার খুবই কম। হৃদয় বলেন, যদিও বড় টুর্নামেন্টের আগে ট্রফি জেতার লক্ষ্য সবার থাকে, কিন্তু মাঠে সেই স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হচ্ছে দল। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, মাত্র একটি সিরিজের পারফরম্যান্স দিয়ে পুরো দলকে বিচার করা ঠিক হবে না, কারণ একই দল ঘরের মাঠে পরাশক্তিদের হারিয়েছে। তবে বিদেশের মাটিতে ধারাবাহিক ব্যর্থতা যে দলকে অনেক পেছনে ঠেলে দিচ্ছে, সেটি তিনি দৃঢ়তার সাথেই স্বীকার করেছেন। বিপরীত চিত্র বিদেশের মাটিতে; যেখানে পাঁচ ম্যাচের মধ্যে জয় মাত্র একটিতে, হার চারটিতে। তিনি শেষদিকে যোগ করেন, কথা বা পরিকল্পনার স্তরে আলোচনা হলেও তা মাঠে রূপান্তর করতে না পারাই এখন দলের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
পরিশেষে, তাওহিদ হৃদয় স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, কেবল পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, মাঠের পারফরম্যান্সে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। বিদেশের প্রতিকূল কন্ডিশনে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে না তুলতে পারলে এবং কঠিন সময়ে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে। দলের ব্যাটিং ইউনিটের এই মানসিক পরিবর্তনের এখনই সময় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

