আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের অকৃত্রিম ভালোবাসা: ম্যারাডোনা থেকে মেসি

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিক বাংলাদেশের সমর্থকদের মাঝে আবারও তীব্র উন্মাদনা তৈরি করেছে। ম্যাচ শেষে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে বন্ধুদের কাঁধে চড়ে আর্জেন্টিনার পতাকা গায়ে জড়িয়ে তরুণদের উল্লাস করতে দেখা গেছে। যদিও বাংলাদেশ কখনো ফিফা বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়নি, তবুও বিশ্বকাপ এলে দেশের অলিগলি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কিংবা পাড়ার মাঠগুলো ফুটবল উৎসবে পরিণত হয়। জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখা এবং আকাশি-সাদা পতাকার সমারোহ যেন এখন বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার প্রতি এই ভালোবাসার শুরুটা মেসির হাত ধরে হয়নি। ৫০ বছর বয়সী ঢাকার বাসিন্দা আব্দুল হাই জানান, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ থেকেই তিনি ডিয়েগো ম্যারাডোনার ভক্ত হয়ে ওঠেন। ম্যারাডোনার অসাধারণ দক্ষতা, আবেগ এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল সে সময় তরুণ প্রজন্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সাবেক জাতীয় ফুটবল খেলোয়াড় ও কোচ শফিকুল ইসলাম মানিকের মতে, ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর ম্যারাডোনার নৈপুণ্য এদেশের অসংখ্য মানুষকে আর্জেন্টিনার প্রতি আকৃষ্ট করে। তিনি উল্লেখ করেন, সেই সময় থেকেই ব্রাজিলের সাথে আর্জেন্টিনার এক নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম হয়, যা ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ম্যারাডোনার কান্নার মধ্য দিয়ে আরও জোরালো হয়।

দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার পর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় আব্দুল হাইয়ের মতো ভক্তদের কাছে ছিল এক পরম প্রাপ্তি। আধুনিক প্রজন্মের কাছে মেসিই এখন মূল অনুপ্রেরণা। দ্বীন ইসলামের মতো বেসরকারি চাকরিজীবীরা মেসির খেলা দেখেই সমর্থক হয়েছেন, আবার জহিরের মতো অনেকে পরিবারের কাছ থেকে এই সমর্থনের উত্তরাধিকার পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপের অধিকাংশ ম্যাচ গভীর রাত বা ভোরে হলেও সমর্থকদের উৎসাহে কোনো ভাটা পড়েনি। জহিরের মতে, আর্জেন্টিনার ম্যাচের দিন অ্যালার্ম ছাড়াই তাদের ঘুম ভেঙে যায়।

এই ফুটবলপ্রেম এখন শুধু মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ২০২২ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়, যার ফলে ৪৫ বছর পর ২০২৩ সালে ঢাকায় পুনরায় দূতাবাস চালু করে আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসাও নিজেও বিভিন্ন পাবলিক স্ক্রিনিংয়ে সমর্থকদের সঙ্গে খেলা উপভোগ করেছেন। পরিবারের ভেতরেও এই সমর্থন নিয়ে চলে মজার সব বিতর্ক। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আইমানের বড় ভাই সালমান আর্জেন্টিনার অন্ধ ভক্ত, অথচ তাদের পরিবারে বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক হলেও মা আবার ব্রাজিলের সমর্থক।

ক্রীড়া বিশ্লেষক শাহনূর রব্বানী মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ সবসময় বিশ্ব ফুটবলের নায়কদের অনুসরণ করতে পছন্দ করে। তবে এই ব্যাপক জনপ্রিয়তার বিপরীতে বাংলাদেশের নিজস্ব ফুটবলের অবস্থান হতাশাজনক। শাহনূর রব্বানী ও শফিকুল ইসলাম মানিক উভয়েই একমত যে, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, আধুনিক একাডেমি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের অভাবে দেশীয় ফুটবল কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছে না। তারা মনে করেন, ক্রিকেটের মতো ফুটবলেও সঠিক বিনিয়োগ ও রোডম্যাপ তৈরি করা হলে জাতীয় গৌরবের প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব।

ক্রিকেটের উদাহরণ টেনে শাহনূর রব্বানী বলেন, ১৯৯৭ সালে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া কিংবা ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর পর পুরো দেশ যেভাবে আনন্দে ভেসেছিল, তা ছিল জাতীয় গৌরবের প্রতিফলন। তার মতে, খেলাধুলা যখন একটি জাতিকে একত্রিত করতে পারে, তখন এই খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া জরুরি।