ফুটবল: মাঠের একটি বল যেভাবে কোটি মানুষের বিশ্বাস হয়ে ওঠে

মসজিদে আজান হয়, গির্জার ঘণ্টা বাজে, মন্দিরে পূজার ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ নিজের বিশ্বাসের জায়গায় ছুটে যায়। তবে আরেকটি জায়গা আছে যেখানে কোনো ধর্মগ্রন্থ বা উপাসনালয় ছাড়াই লাখো মানুষ আবেগ নিয়ে জড়ো হয়। সেখানে আছে একটি সবুজ মাঠ, একটি বল, দুটি গোলপোস্ট আর বুকভরা বিশ্বাস। ফুটবল হয়ে ওঠে বিশ্বাস, পরিচয় এবং অনেকের কাছে প্রায় ধর্মের মতো। বিশ্বের আর কোনো খেলাই এমন ক্ষমতা রাখে না। একটি গোলের জন্য মানুষ প্রার্থনা করে, ম্যাচের আগে একই জার্সি পরে, এমনকি কেউ কেউ সৌভাগ্যের তাবিজ সঙ্গে রাখে। যুক্তি সেখানে হার মানে, জায়গা করে নেয় আবেগ যা বিজ্ঞান দিয়ে সবসময় ব্যাখ্যা করা যায় না।

ব্রাজিলে ফুটবল মানুষের দ্বিতীয় ভাষা। রিও ডি জেনেইরোর বস্তি থেকে সাও পাওলোর ব্যস্ত রাস্তা পর্যন্ত একটি বল মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখায়। পেলের দেশ, গারিঞ্চার দেশ, জিকোর দেশ কিংবা রোনালদোদের দেশ বিশ্বাস করে, ফুটবল তাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ। পাঁচটি বিশ্বকাপ ট্রফি তাদের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, আর মারাকানার কান্না তাদের ইতিহাসের অংশ। আর্জেন্টিনায় দিয়েগো ম্যারাডোনা কেবল কিংবদন্তি নন, আবেগের নাম। ২০২২ সালে লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ ওঠার পর লাখো মানুষের কান্না ছিল কেবল শিরোপা জয়ের আনন্দ নয়, বরং তিন দশকের দীর্ঘশ্বাসের মুক্তি ও হারানো বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প। মরক্কোও দেখিয়েছে, ফুটবল দেশের সীমানার মধ্যেও আটকে থাকে না; ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে তারা পুরো আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের স্বপ্ন ও আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

ইংল্যান্ডে ফুটবল ইতিহাস, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শত বছরের ক্লাব সংস্কৃতি ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দলের প্রতি ভালোবাসা প্রতিটি ম্যাচকে উৎসবে পরিণত করেছে। ‘ফুটবল ইজ কামিং হোম’ বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অর্ধশতাব্দীর অপেক্ষা, ব্যর্থতা, আশা আর অটুট বিশ্বাস। বাংলাদেশে বিশ্বকাপ এলেই বদলে যায় দেশের চেহারা। গ্রামের মেঠোপথ থেকে রাজধানীর উড়ালসেতু পর্যন্ত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা অন্যান্য দেশের পতাকায় রঙিন হয়ে ওঠে চারপাশ। রাতভর জেগে খেলা দেখা, পরদিন চায়ের দোকানে ম্যাচ বিশ্লেষণ, আর জয়-পরাজয় নিয়ে তর্ক-হাসি-অভিমান বাংলাদেশের মানুষের এক পারিবারিক উৎসবে পরিণত হয়। বাবা ছেলেকে অফসাইডের নিয়ম বোঝান, দাদা শোনান পেলে কিংবা ম্যারাডোনার গল্প। এটাই ফুটবলের বিস্ময় যে, হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি খেলা কীভাবে মানুষের হৃদয়ে নিজের জায়গা করে নেয়।

ফুটবলের এই শক্তি কেবল ৯০ মিনিটে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষকে একত্র করে, অচেনা মানুষকে আপন করে এবং ভাষা, ধর্ম, বর্ণ বা রাজনীতির বিভাজনের ওপরে সমর্থক তৈরি করে। স্টেডিয়ামে পাশের মানুষটি কোন ধর্মের বা কোন পেশার তা জানার দরকার হয় না, গোলের পর দুজন মানুষ একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেন। বিশ্বকাপের ৩৯ দিনে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ একই গল্পের অংশ হয়ে যায়। ফুটবল ধর্ম নয়, বিশ্বাসব্যবস্থার বিকল্পও নয়, তবুও এটি মানুষের আবেগকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে। বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বাজবে, আলো নিভে যাবে, গ্যালারি ফাঁকা হবে এবং ট্রফি চলে যাবে নতুন চ্যাম্পিয়নের হাতে। কিন্তু মানুষের বিশ্বাস শেষ হয় না। একটি শিশু আবার বল নিয়ে মাঠে নামবে, কেউ নতুন জার্সি কিনবে, কেউ দেয়ালজুড়ে প্রিয় খেলোয়াড়ের ছবি টাঙিয়ে রাখবে। এভাবেই আবার চার বছরের অপেক্ষা শুরু হয়।