বিস্ময় নিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে আসা মো. সাহাবুদ্দিনের বিতর্কিত বিদায়

২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি যখন মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখন খোদ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যেও বিস্ময় তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁর নাম সে সময় কারও ভাবনায় ছিল না। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানার সিদ্ধান্তে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয় এবং সংসদে দলের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তবে এই নিয়োগের কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা তখন দেওয়া হয়নি।

সাহাবুদ্দিন তখন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন এবং তার কয়েক মাস আগে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে দলের জাতীয় সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু বিচারক হিসেবে তাঁর অতীত সুনাম খুব একটা ভালো ছিল না। পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি আরও বেশি বিতর্কের জন্ম দেন।

দুদকের দায়িত্ব শেষে তিনি বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা দুটি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হন। রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর আইনগত যোগ্যতা নিয়েও আদালতে প্রশ্ন উঠেছিল। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতির ভূমিকা এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র সংক্রান্ত পরস্পরবিরোধী বক্তব্য তাঁকে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। দীর্ঘ তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালনের পর শুক্রবার তিনি পদত্যাগ করেন।

অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ সাহাবুদ্দিন ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুদকের কমিশনার ছিলেন। সেই সময় পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দুদকের তদন্তে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১২ সালে সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও ২০১৪ সালে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে তা শেষ করে দেওয়া হয়। সাহাবুদ্দিন বিভিন্ন সময় দাবি করেছিলেন যে, বিশ্বব্যাংকের চাপে মামলাটি করা হয়েছিল এবং দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে গণ-অভ্যুত্থানের পর দুদক মামলাটি পুনরায় অনুসন্ধান শুরু করে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন দাবি করেন, পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁর অভিযোগ ছিল, তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামান ও কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন তদন্তটি ধামাচাপা দিয়েছিলেন। যদিও এই অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত হয়নি।

দুদকে থাকাকালীন বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির তদন্ত নিয়েও সংস্থাটি প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। ২০১৫ সালে ২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৫৬টি মামলা হলেও ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু ও পরিচালনা পর্ষদকে আসামি করা হয়নি। আট বছর পর ২০২৩ সালে দুদক বাচ্চুকে আসামি করে। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপের কারণেই পরিচালকদের আসামি করা সম্ভব হয়নি।

দুদকের দায়িত্ব ছাড়ার পর সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেন। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিলে তিনি সেখানে স্বতন্ত্র পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান হন। এ ছাড়া এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টাও ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ব্যাংকগুলোর পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের বিপুল অর্থ বের করে নেওয়ার তথ্য সামনে আসে। পর্ষদে থাকার কারণে সমালোচকেরা তাঁকে ‘এস আলমের প্রতিনিধি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। দুদক আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী, সাবেক কমিশনাররা প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে নিয়োগের যোগ্য নন—এই যুক্তিতে তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছিল। তবে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ তা খারিজ করে দেয়।

সাহাবুদ্দিনের মেয়াদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয় শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে। ৫ আগস্ট রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু অক্টোবরে দৈনিক মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, তিনি শুনেছেন শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু এর কোনো দালিলিক প্রমাণ তাঁর কাছে নেই।

এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ‘মিথ্যাচার’ ও শপথ লঙ্ঘনের শামিল বলে মন্তব্য করেন। এরপর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। পরবর্তীতে বঙ্গভবন থেকে বিবৃতি দিয়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগকে ‘মীমাংসিত বিষয়’ বলে নতুন বিতর্ক না করার আহ্বান জানানো হয়।

সম্প্রতি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে থাকা অবস্থায় মো. সাহাবুদ্দিন দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। যদিও এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কার্যকর ভূমিকা না রাখার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের পর বিরোধী দলের সদস্যরা তাঁর ভাষণের সময় প্রতিবাদ ও ওয়াকআউট করেন। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম তাঁকে অভিশংসন ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে অভিযোগ করেন যে, তিনি শপথ ভঙ্গ করেছেন এবং আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত।

যে বিস্ময় নিয়ে তিনি বঙ্গভবনে প্রবেশ করেছিলেন, দীর্ঘ তিন বছর তিন মাস পর সেই বিতর্কিত অতীত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার বোঝা মাথায় নিয়েই তাঁকে বিদায় নিতে হলো।