সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুক দিল্লির একটি হাসপাতালে ২৬ দিনের অনশন শেষ করেছেন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তিনি এই অনশন ভাঙেন। তার এই সিদ্ধান্ত ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলনের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখন নানা মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ইনস্টাগ্রামে হাসপাতাল থেকে একটি ছবি শেয়ার করে সোনাম ওয়াংচুক জানান, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা, ডা. জিতেন্দ্র সিং এবং লেহ-লাদাখের শীর্ষ সংস্থার নেতাদের উপস্থিতিতে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৬৫ জন সংসদ সদস্য তাকে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। দেশে সহিংসতার আশঙ্কায় এবং বিভিন্ন শর্ত নিয়ে আলোচনার পর তিনি এই পথে হেঁটেছেন।
সোনাম ওয়াংচুক জানান, তিনি শিগগিরই একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বিস্তারিত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করবেন। তবে তার আগে তিনি সমর্থকদের শান্ত থাকার এবং কোনো ধরনের সহিংসতায় না জড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। পরে তিনি একটি ভিডিও বার্তায় এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণগুলো বিস্তারিত তুলে ধরেন।
এদিকে, সোনাম ওয়াংচুকের সুস্থতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বার্তা দিয়েছেন। তিনি সোনামকে চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলার এবং দ্রুত শারীরিক ওজন ফিরে পাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি সোনামের সুস্থতার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনাও করেছেন।
অন্যদিকে, সোনাম ওয়াংচুকের অনশন ভাঙার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, সোনাম ওয়াংচুক নিজের জীবন বাজি রেখে জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত যন্তর মন্তরে তাদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।
সোনাম ওয়াংচুক অনশন ভাঙার আগেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের প্রতি পুলিশের আচরণ নিয়ে বিজেপির ভেতর থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল। প্রবীণ বিজেপি নেতা ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মুরলী মনোহর যোশী এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ছাত্রছাত্রীদের উদ্বেগ যথার্থ এবং তা সহানুভূতি ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। তিনি নারীদের ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিজেপি সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবেও সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে প্রশাসনের উদাসীনতার সমালোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী মোদী এরই মধ্যে শিক্ষা সচিবকে পরিবর্তন করেছেন, যিনি প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিয়ে উদাসীন ছিলেন।
শুক্রবার সরকার ও সিজেপি-র আন্দোলনকারীদের মধ্যে একটি নিরপেক্ষ স্থানে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সোনাম ওয়াংচুক জানিয়েছেন, গত দুই দিন ধরে সরকারের সঙ্গে তার দরকষাকষি চলছিল। তিনি লিখিত আশ্বাসের অপেক্ষায় ছিলেন, যার ফলে অনশন ভাঙতে আরও দুই দিন দেরি হয়েছে।
সরকারের কাছ থেকে পাওয়া লিখিত আশ্বাসের বিষয়ে সোনাম জানান, যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী বা ২০শে জুলাই ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়াদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ বা এফআইআর নেওয়া হবে না। এছাড়া প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মৃত ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীর পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয়ত, সংসদে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে সরকার কোনো আশ্বাস দেয়নি বলে তিনি জানান।
সোনাম ওয়াংচুক বলেন, তার সামনে দুটি পথ ছিল—অনশন চালিয়ে যাওয়া অথবা জীবন বাঁচিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া। তিনি মনে করেন, তিনি যা চেয়েছেন তার বড় অংশই আদায় করতে পেরেছেন। তার কাছে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা না হওয়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শুক্রবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রশ্নপত্র ফাঁস মামলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, সরকার এরই মধ্যে অনেককে গ্রেফতার করেছে এবং ২২ লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্য পুনরায় পরীক্ষা নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, ফাস্ট ট্র্যাক আদালতে এই মামলার শুনানি এবং কঠোর শাস্তির বিধানের জন্য একটি বিল সোমবার থেকে শুরু হওয়া সংসদের দ্বিতীয় সপ্তাহে পেশ করার চেষ্টা করা হবে। এই লক্ষ্যে বিভাগগুলোকে দ্রুত খসড়া তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই আন্দোলনের মাঝেই কেন্দ্র সরকার উচ্চশিক্ষা ও স্কুল শিক্ষা বিভাগে বড় ধরনের রদবদল করেছে। নরেশ পাল গাঙ্গোয়ারকে উচ্চশিক্ষা সচিব এবং টিকে অনিল কুমারকে স্কুল শিক্ষা সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) প্রধান হিসেবে অভিষেক সিংকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে সরকারের এই প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক সুশান্ত সিং। তিনি এক্স-এ লিখেছেন, প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিলেও আসল প্রশ্ন থেকে যায়—কেন প্রধানমন্ত্রী মোদী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদ থেকে সরিয়ে দিচ্ছেন না?
অনশনের ২১তম দিনে পুলিশ সোনাম ওয়াংচুককে জোর করে যন্তর মন্তর থেকে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো জানিয়েছিলেন, রাজনৈতিক নেতারা যদি সংসদে শিক্ষা ব্যবস্থার জবাবদিহিতার বিষয়টি তোলার আশ্বাস দেন, তবেই তিনি অনশন ভাঙবেন।
অনেকে এই শর্তকে সহজ হিসেবে দেখলেও, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ভাষ্যকার অপূর্বানন্দ বিষয়টিকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি মনে করেন, জবাবদিহিতার বোঝা সরকার থেকে বিরোধী দলের দিকে চলে গেছে, যা বিড়ম্বনার সৃষ্টি করেছে।
গীতাঞ্জলি আংমো এর আগে রাহুল গান্ধীর ধর্নার সমালোচনা করেছিলেন, যা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে কিছুটা উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সোনাম ওয়াংচুক জানিয়েছেন, সম্ভাব্য সহিংসতা এড়াতেই তিনি অনশন ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সোনাম ওয়াংচুকের অনশন শেষে অল্ট নিউজের প্রতিষ্ঠাতা প্রতীক সিনহা তাকে সুস্থ হয়ে ওঠার পরামর্শ দিয়েছেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডার অবিনাশ পালিওয়াল একে একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, ভারতের যুবসমাজ এখন নতুন ভারত কেমন হবে তা নির্ধারণ করতে শুরু করেছে।
নিট-ইউজি ২০২৬-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে সিজেপি তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এই ঘটনায় ২২ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০শে জুন শুরু হওয়া এই আন্দোলনের মূল দাবিগুলো হলো—প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের জন্য জবাবদিহিতা, শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।
সোনাম ওয়াংচুক ২৮শে জুন এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেছিলেন। সিজেপি শুক্রবার অর্থাৎ ২৪শে জুলাই দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। দিল্লির পাশাপাশি কলকাতা, মুম্বাই ও বিহারসহ বিভিন্ন রাজ্যে এই আন্দোলনের সমর্থনে কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
আন্দোলনের এই পর্যায়ে এসে সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক সংস্কার এবং কঠোর আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীরা এখনো অনড়। সোনাম ওয়াংচুকের অনশন ভাঙার পর আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
সরকার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে শুক্রবারের বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এই বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয় কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতি।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে যে দাবি উঠেছে, তা ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সোনাম ওয়াংচুকের এই দীর্ঘ অনশন ভারতের শিক্ষা খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আন্দোলনকারীরা মনে করছেন, তাদের দাবিগুলো সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

