বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং আমূল সংস্কারের দাবিতে একজোট হয়েছে ইউরোপের চারটি প্রধান ফুটবল লিগ। ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগ, স্পেনের লা লিগা, ইতালির সেরি আ এবং জার্মানির বুন্দেসলিগা কর্তৃপক্ষ শুক্রবার যৌথভাবে এই আহ্বান জানিয়েছে। তারা মনে করে, ফুটবলের অভিভাবক হিসেবে ফিফার বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোতে বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে। বিশেষ করে ফিফার ভেতরে ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি তৈরির পরিকল্পনা প্রকাশের পর থেকেই সংস্থাটি তীব্র সংকটে পড়েছে, যদিও পরবর্তীতে সেই বিতর্কিত পরিকল্পনাটি স্থগিত করা হয়েছে। এই বিষয়টি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
শাসনব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কারের দাবি
চারটি লিগ তাদের যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ফিফার ভেতরে শাসনতান্ত্রিক সীমানা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তাদের মতে, শৃঙ্খলামূলক বিষয়গুলো যেন রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান সংস্কারের মূল লক্ষ্য। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইউরোপীয় লিগ এবং ওয়ার্ল্ড লিগস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে আমরা সবাই মিলে কথা বলছি, কারণ আমরা জানি ফিফার এই নিরন্তর সম্প্রসারণবাদী মানসিকতা কীভাবে সবার ওপর প্রভাব ফেলে।’
ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যখন জাতীয় ফেডারেশনগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে শাসনকাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন, ঠিক তখনই এই তীব্র প্রতিক্রিয়া সামনে এল। ইনফান্তিনো পুরুষ ও নারী ফুটবল বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আনার যে এফএফই পরিকল্পনা করেছিলেন, তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে রয়েছেন। চার লিগ কর্তৃপক্ষ এই প্রকল্পটিকে ‘ফিফার ইতিহাসে ক্ষমতার অপব্যবহারের অন্যতম বড় ঘটনা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা মনে করে, কেবল অগভীর কোনো পরিবর্তন বা প্রক্রিয়াগত সংস্কারই সমস্যার সমাধানে যথেষ্ট নয়। তবে ফিফার সব ব্যর্থতার দায় কেবল ইনফান্তিনোর ওপর চাপাতে নারাজ এই লিগগুলো। তাদের মতে, এই শাসনতান্ত্রিক সংকট একজন ব্যক্তির ভূমিকার চেয়ে অনেক বেশি গভীর।
নতুন প্রস্তাব ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা
- জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, লিগ, ক্লাব এবং খেলোয়াড়দের প্রতিনিধিত্বকারী একটি স্থায়ী সংস্থা গঠন করতে হবে।
- এই নতুন সংস্থাটিকে ফিফার প্রতিটি নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য প্রদান করতে হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অর্থবহ ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
- ফিফার বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড থেকে তাদের ‘নিয়ন্ত্রক ও অভিভাবক’ সত্তাকে আলাদা করতে হবে।
- যেকোনো বড় প্রস্তাবের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে এবং তার প্রভাব নিয়ে আগে থেকেই স্বাধীন পর্যালোচনা প্রকাশ করতে হবে।
আগামী ১৮ মার্চ ২০২৭ তারিখে ফিফার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রার্থী। তবে তার পক্ষে ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক সৌদি আরব, আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ) এবং দক্ষিণ আমেরিকার কনমেবল (কনমেবল) সরাসরি সমর্থন জানিয়েছে। অপরদিকে, উয়েফা, কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন গত আগস্ট মাসে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। এখন দেখার বিষয়, ইউরোপীয় লিগগুলোর এই চাপের মুখে ফিফার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন আসে কি না। লিগগুলো জানিয়েছে, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ১০০ দিনের মধ্যে তাদের উত্থাপিত নীতিগুলো মেনে চলার প্রতিশ্রুতি প্রদানকারী প্রার্থীদেরই তারা সমর্থন করবে।

