সব শ্রেণি-পেশার অংশগ্রহণে সফল চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান: মাহদী আমিন

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, সব শ্রেণি-পেশার গণমানুষ ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত অংশগ্রহণে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সেদিন ফ্যাসিবাদের পতনের লক্ষ্যে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল সর্বস্তরের জনগণ।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘ফল উৎসব-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাহদী আমিন এসব কথা বলেন। তিনি জানান, বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের কোমলমতি শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে মাদ্রাসা, কলেজ এবং পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা একযোগে এই আন্দোলনে শামিল হয়েছিল। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, ফ্যাসিবাদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে রাজপথে রক্ত ঢেলে দিয়েছেন সমাজের প্রান্তিক ও তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষও। রাস্তার দিনমজুর, হকার, রিকশাচালক, গার্মেন্টস শ্রমিক, কৃষক, প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং সর্বস্তরের নারীরা—বিশেষ করে মায়েরা এই গণঅভ্যুত্থানে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন।

গণঅভ্যুত্থানের আন্তর্জাতিক কণ্ঠস্বর ছিলেন প্রবাসীরা। দেশে যখন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে দেওয়া হয়েছিল, তখন প্রবাসীরাই বিশ্ব দরবারে স্বৈরাচারের নির্মমতার চিত্র তুলে ধরেছেন। তারা বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ করেছেন, রেমিট্যান্স শাটডাউনের ডাক দিয়ে ফ্যাসিবাদের অর্থনৈতিক ভিত নাড়িয়ে দিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিতে অনন্য অবদান রেখেছেন। ডিজিটাল ফ্রন্টে লড়েছেন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্টরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, সাইবার নিরাপত্তা আইনের ভয় তোয়াক্কা না করে তারা রাজপথের প্রতি মুহূর্তের আপডেট, ভিডিও এবং তথ্য ছড়িয়ে দিয়েছেন। প্রোপাগান্ডা ও গুজব রুখে দিয়ে তারা জনমত গঠনে এবং সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নেমে আসতে উদ্বুদ্ধ করতে মূল ভূমিকা পালন করেছেন।

মাহদী আমিন গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আবেগঘন ও শক্তিশালী দিক হিসেবে নারী ও মায়েদের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কেবল ছাত্রীরাই রাজপথে বুক চিতিয়ে লড়েনি, মায়েরা তাদের সন্তানদের বাঁচাতে ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আন্দোলনে শহিদদের মায়েদের কান্না ও সাহসী অবস্থান পুরো জাতিকে স্বৈরাচার পতনের চূড়ান্ত লড়াইয়ে নামতে বাধ্য করেছিল।

প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের এবং অবশ্যই প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের। যেহেতু বিএনপি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, তাদের ৬০ লক্ষ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মী এবং পেশাজীবী সংগঠন ও সহযোগী সংগঠন সর্বস্ব দিয়ে জনগণের সাথে থেকেছিল। তিনি আরও জানান, বিএনপি সেই দল যারা গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে বেশি গুম-খুন, হামলা-মামলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছিল। কেবল গণঅভ্যুত্থানেই এই দলের ৪০০-এর বেশি নেতাকর্মী শহিদ হয়েছেন। এছাড়া, বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের ১৪০ জনের বেশি শহিদ হয়েছিলেন।

দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর ও তাদের ঢাল হিসেবে কাজ করার স্পষ্ট নির্দেশনা দেন। তার দূরদর্শী রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা, আন্দোলনকে বেগবান করতে জাতীয় ঐক্যের ডাক এবং বিএনপির লাখো নেতাকর্মীর রাজপথে আত্মত্যাগ এই গণঅভ্যুত্থানকে একটি সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরিপূরক ভূমিকা পালন করেছে।

মাহদী আমিন বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষাই ছিল দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমতা এবং সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে। তিনি আরও বলেন, আজকে ফ্যাসিবাদ পরবর্তী বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে সেই বৃহত্তর ঐক্যকে আবারও ধারণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভিন্ন মত, ভিন্ন পথ, ভিন্ন আদর্শ, ভিন্ন মূল্যবোধ থাকবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করব, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা দেশপ্রেম ধারণ করব, ততক্ষণ পর্যন্ত জাতির বৃহত্তর স্বার্থের জায়গাগুলোতে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জায়গাতে, জনগণের অধিকার এবং স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমরা অটুট থাকব, একসাথে কাজ করে যাব। সেখানে প্রতিটি পেশার এবং শ্রেণির মানুষ যেভাবে গণঅভ্যুত্থানে এবং ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছিল, সেই ধারাবাহিকতায় আজকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ঐতিহাসিক ১৬ জুলাই উপলক্ষে অনুষ্ঠানের শুরুতেই মাহদী আমিন শহিদ আবু সাঈদ, শহিদ ওয়াসিম আকরামসহ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আত্মদানকারী সব শহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ডিআরইউ-এর সভাপতি আবু সালেহ আকনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামসহ সংগঠনটির কার্যনির্বাহী কমিটির নেতারাসহ এবং সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সদস্যবৃন্দ।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত