হংকংয়ের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি তাদের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত শুনানিতে উঠে এসেছে কীভাবে যথাযথ তদারকির অভাব এবং নানা অনিয়ম একটি ছোট অগ্নিকাণ্ডকে ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে রূপ দিয়েছিল।
গত নভেম্বরে তাই পো জেলার ওয়াং ফুক কোর্ট অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের সাতটি ভবনে ছড়িয়ে পড়া সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬৮ জন নিহত হন। সেই সাথে গৃহহীন হয়ে পড়েন হাজার হাজার বাসিন্দা, যাদের অনেকেই বর্তমানে অস্থায়ী আবাসস্থলে বসবাস করছেন।
তদন্ত কমিটির প্রধান আইনজীবী ভিক্টর ডয়েস জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় কমপ্লেক্সটিতে বড় ধরনের সংস্কার কাজ চলছিল। তার মতে, অগ্নিকাণ্ডের দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল অগ্নি-প্রতিরোধক নয় এমন স্ক্যাফোল্ডিং নেটিং বা জাল ব্যবহার। এছাড়া সিঁড়ির জানালাগুলো কাঠের তক্তা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বাসিন্দাদের পালানোর পথে ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি হয়েছিল, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
আইনজীবী ডয়েস নির্মাণকাজের সাথে জড়িত উইল পাওয়ার আর্কিটেক্টস কোম্পানি এবং প্রধান ঠিকাদার প্রেস্টিজ কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোং-এর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণকাজে নানাভাবে ফাঁকি দিয়েছে, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করেছে এবং বাড়িওয়ালা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ধোঁকা দিয়েছে। এমনকি পরিদর্শনের ক্ষেত্রেও জালিয়াতি করা হয়েছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক পেশাজীবী কোনো যাচাই ছাড়াই নথিতে স্বাক্ষর করেছেন, যাকে তিনি 'রাবার স্ট্যাম্প' ব্যবহারের সাথে তুলনা করেছেন।
সরকারি তদারকি ব্যবস্থার সমালোচনা করে ডয়েস বলেন, সরকার এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে সম্মানসূচক বা অনার সিস্টেমের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছিল। তিনি বলেন, যখন অসাধু ব্যক্তিদের মোকাবিলা করতে হয়, তখন পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এই শুনানির সময় অনেক ভুক্তভোগী পরিবার কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবী জেনকিন সুয়েন গত বৃহস্পতিবার স্বীকার করেন যে, ব্যবস্থাগত কিছু দুর্বলতা ছিল। তবে তিনি দাবি করেন, সরকারি বিভাগগুলোকে সরাসরি অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী করা অনুচিত। বরং কিছু অসাধু পেশাজীবী ও ঠিকাদার জনগণের সুরক্ষার জন্য তৈরি করা নিয়মকে অপব্যবহার করেছেন।
ওয়াং ফুক কোর্টের নয়জন বাসিন্দার পক্ষে আইনজীবী জেফ্রি টাম বলেন, অনেক বাসিন্দা চরম মানসিক কষ্টের মধ্যেও সাক্ষ্য দেওয়ার সাহস দেখিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু সাক্ষীকে দেখে মনে হয়েছে তারা দায় এড়াতে চাইছেন, যা বাসিন্দাদের ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, দায় এড়ানোর এই প্রবণতা সত্য উদঘাটনে কোনো সহায়তা করবে না।
হাইকোর্টের বিচারক ডেভিড লকের নেতৃত্বাধীন এই তদন্ত কমিটি অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও বিদ্যমান নিয়মের সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা শেষে সুপারিশ প্রদান করবে। তবে এই কমিটির কাজের পরিধিতে আইনি দায়বদ্ধতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নয়, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে রয়েছে। উল্লেখ্য, গত জুন মাসে হংকং কর্তৃপক্ষ উইল পাওয়ার এবং প্রেস্টিজ কনস্ট্রাকশনসহ সাত ব্যক্তি ও দুটি কোম্পানির বিরুদ্ধে নরহত্যা ও জালিয়াতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে।

