ইসলামী ব্যাংকের অস্থিরতায় উদ্বিগ্ন ব্যাংকাররা, সমাধানের আশ্বাস গভর্নরের

দেশের ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীরা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে ঘিরে চলমান অস্থিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিমত, দেশের বৃহত্তম এই ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতি সমগ্র ব্যাংকিং শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দ্রুত সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

মঙ্গলবার (৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ব্যাংকারদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান এসব তথ্য জানান।

এবিবি চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন যে, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাংকাররা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে এর প্রভাব কেবল একটি ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর পড়ছে। আমানত প্রত্যাহার, গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ বৃদ্ধি এবং বাজারে নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাংকাররা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

এবিবি চেয়ারম্যান আরও জানান, বৈঠকের শেষ অংশে ইসলামী ব্যাংকের বিষয়টি দীর্ঘক্ষণ ধরে আলোচনা করা হয়। গভর্নর ব্যাংকারদের সামনে ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন এবং অত্যন্ত খোলামেলা ও বস্তুনিষ্ঠভাবে পুরো চিত্র তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, গভর্নর দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যাটির দ্রুত সমাধানে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। কারণ, ইসলামী ব্যাংক দেশের বৃহত্তম ব্যাংক হওয়ায় এর অস্থিরতা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করছে।

এবিবি চেয়ারম্যানের ভাষ্যমতে, গভর্নর নিজেও স্বীকার করেছেন যে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকট এখন কেবল ব্যাংকিং খাতের বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি রাজনৈতিক মাত্রাও লাভ করেছে। এ কারণে, বিষয়টির সমাধানে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে এবিবি চেয়ারম্যান জানান, গভর্নরকে এই বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানে দেখা গেছে এবং তিনি আশাবাদী যে দ্রুত একটি কার্যকর সমাধান বেরিয়ে আসবে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন ও রাজনৈতিক চাপ

বৈঠকে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের আলোচিত ১৮(ক) ধারা নিয়েও আলোচনা হয়। এবিবি চেয়ারম্যান বলেন, ৭.৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে সাবেক পরিচালকদের পুনরায় ব্যাংকে ফেরার যে সুযোগ রাখা হয়েছিল, সেটি বাতিলের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এ বিষয়ে গভর্নর তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এবং তিনি ওই বিধানের পক্ষে নন বলেও জানিয়েছেন।

এই প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে তিনি ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রতি কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানান। বৈঠকে তিনি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে সিআইবিতে তথ্য হালনাগাদ না হওয়ার কারণ জানতে চান এবং কোনো চাপ এলে তা সরাসরি তাঁকে জানানোর নির্দেশ দেন।

তবে, ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক চাপের মুখে ঋণ দিতে হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এবিবি চেয়ারম্যান জানান যে, তাঁর কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে এমনটি বিশ্বাস করেন না।

নতুন ঋণ প্যাকেজ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি

একই বৈঠকে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন ঋণ প্যাকেজ নিয়েও আলোচনা হয়। এবিবি চেয়ারম্যান জানান, রিফাইন্যান্স স্কিমের আওতায় বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই তহবিলের মাধ্যমে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা অর্থায়ন পাবেন। তাঁর মতে, খেলাপি ঋণের পর বর্তমানে ব্যাংক খাতের দ্বিতীয় বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ হলো ঋণ প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি করা, এবং এই নতুন প্যাকেজটি সেই ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।

বৈঠকে ব্যাংকাররা সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও সংস্কার নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠক শেষে এবিবি চেয়ারম্যান মন্তব্য করেন যে, দীর্ঘদিন পর এটি ছিল একটি ফলপ্রসূ ও প্রাণবন্ত ব্যাংকার্স সভা, যেখানে খাতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে।