ঝিনুক-শামুকই প্রকৃতির ‘বায়োলজিক্যাল ওয়াটার ফিল্টার’, পরিষ্কার করছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

নদী-নালা ও সমুদ্রে মানুষের ফেলা প্লাস্টিক আজ এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করেছে, যা পুরো জলজ জগতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই প্লাস্টিক যখন ভেঙে অত্যন্ত সূক্ষ্ম আণুবীক্ষণিক কণায় পরিণত হয়, তখন তাকে বলা হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক (Microplastics)। এই অদৃশ্য বিষ এতটাই সূক্ষ্ম যে, মানুষের তৈরি আধুনিক ওয়াটার ফিল্টারগুলোও সব সময় এগুলোকে আটকে রাখতে পারে না। তবে এই কঠিন কাজটিই খুব সহজে করে ফেলছে সাধারণ শামুক ও ঝিনুক। বিজ্ঞানীরা এদেরকে প্রকৃতির সবচেয়ে নিখুঁত ‘বায়োলজিক্যাল ওয়াটার ফিল্টার’ (Biological Water Filter) হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সমুদ্র বা নদীর তলদেশে পড়ে থাকা ঝিনুককে নিছকই একটি অলস প্রাণী মনে হতে পারে, যার কাজ শুধু মাটির নিচে বা পাথরের গায়ে আটকে থাকা। কিন্তু বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ঝিনুক ও শামুক নিঃশব্দে আমাদের এই আস্ত পৃথিবীকে এক বিশাল পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়ে চলেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক একর জায়গার একটি ঝিনুকের চড় (Oyster reef) প্রতিদিন কোটি কোটি গ্যালন পানি পরিশোধন করতে পারে। তাদের এই জাদুকরী প্রক্রিয়া নকল করে বিজ্ঞানীরা এখন বড় বড় শহরের ড্রেনেজ ও বর্জ্য পানি শোধনাগার বা ‘বর্জ্য শোধন প্রযুক্তি’ (Waste Water Treatment Plant) বানানোর চেষ্টা করছেন।

একটি ঝিনুক বা 'মাসেল' (Mussel) প্রতিদিন লিটার লিটার পানি নিজের ফুলকা বা গিল (Gill)-এর ভেতরে টেনে নেয়। সেই পানির সাথে থাকা আণুবীক্ষণিক খাবার ছেঁকে নেওয়ার সময় সে পানি থেকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ময়লা—এমনকি প্রতি ঘণ্টায় হাজার হাজার আণুবীক্ষণিক মাইক্রোপ্লাস্টিক কণাও ছেঁকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলে।

সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয়টি হলো, এই ক্ষতিকর প্লাস্টিক ও বিষাক্ত কণাগুলো ঝিনুকের শরীরের ভেতরের পুষ্টি প্রক্রিয়ায় কোনো ক্ষতি তৈরি করে না। সে এগুলোকে একটি বিশেষ জৈব তরল বা শ্লেষ্মা (Mucus) দিয়ে পেঁচিয়ে ভারী গোলকের মতো তৈরি করে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ছদ্ম-মল’ (Pseudofaeces)। এই ভারী কণাগুলো পানির ওপরে ভেসে না থেকে সোজা তলদেশে তলানি হিসেবে জমা হয়ে পড়ে। ফলে উপরিভাগের পানি হয়ে ওঠে পরিষ্কার, নির্মল ও স্বচ্ছ।

চোখ, কান ও হাতবিহীন, একটি খোলসের ভেতরে আটকে থাকা এই ক্ষুদ্র ঝিনুকটিকে কে শেখাল কীভাবে পানি থেকে বিষাক্ত প্লাস্টিক ছেঁকে আলাদা করতে হয়? কে তাকে এই অলৌকিক ডাবল-ফিল্টারিং মেকানিজম দান করল—এই প্রশ্নগুলো ভাবিয়ে তোলে। নিশ্চয়ই তিনিই, যিনি এই বিশাল মহাবিশ্বের অণু-পরমাণু থেকে শুরু করে মহাসমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত সবকিছুর নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। তিনি আমাদের অজান্তেই প্রকৃতির বুকে কোটি কোটি নিঃশব্দ ‘ওয়াটার ফিল্টার’ বসিয়ে রেখে পুরো পৃথিবীর জলজ ভারসাম্য রক্ষা করছেন। আমরা সামান্য প্রযুক্তি বানিয়ে অহংকারে মাটি স্পর্শ করতে চাই না; অথচ রবের তৈরি একটি অণুবীক্ষণিক ঝিনুক প্রতিদিন নিঃশব্দে আমাদেরই ফেলা ময়লা পরিষ্কার করে চলেছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত