খামেনির জানাজা: বিশ্ব রাজনীতির বিভাজন ও প্রতিরোধের নতুন বার্তা

তেহরানের রাস্তায় কালো কাপড়ে মোড়া কফিন নিয়ে এগিয়ে চলা লাখো মানুষের মিছিল এক নতুন ভূরাজনৈতিক বার্তার জন্ম দিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হওয়ার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির এই শেষযাত্রায় যেন শোক আর প্রতিবাদের সুর একাকার হয়ে উঠেছে। টানা ৩৬ বছরের শাসনামলের অবসানে আয়োজিত এই জানাজায় জনসমুদ্রের মধ্যে তোলা লাল মুষ্টিবদ্ধ হাত সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক অস্তিত্বগত লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাত দিন ধরে পাঁচটি শহরজুড়ে বিস্তৃত এই শেষযাত্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, আর্মেনিয়া ও জর্জিয়াসহ শতাধিক দেশের প্রতিনিধিরা এতে উপস্থিত হয়েছেন। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অনেক কর্মীও কোনো সরকারি আমন্ত্রণ ছাড়াই এতে যোগ দিয়েছেন। কুম শহর থেকে শুরু হয়ে ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে কফিনটি শেষ পর্যন্ত মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারের পাশে দাফন করা হবে।

পশ্চিমা বিশ্ব এই বিশাল আয়োজনকে শাসকগোষ্ঠীর প্রচারযন্ত্র বা বৈধতা খোঁজার মরিয়া চেষ্টা হিসেবে দেখলেও এটি গ্লোবাল সাউথের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করে। এটি ১৯৫৩ সালের অপারেশন অ্যাজ্যাক্স থেকে শুরু করে ইরাক যুদ্ধ, লিবিয়ার ধ্বংসযজ্ঞ ও সিরিয়ার সংকটের মতো পশ্চিমা আধিপত্যের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনও স্বীকার করেছে যে, ইরানের নেতৃত্ব এত বিস্তৃত যে কেবল একজন শীর্ষ ব্যক্তিকে সরিয়ে দেশটিকে অচল করা সম্ভব নয়।

সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞায় পশ্চিমা ও গ্লোবাল সাউথের দৃষ্টিভঙ্গির এই পার্থক্য খামেনির জানাজায় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এক পক্ষের কাছে বিচার মানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, অন্য পক্ষের কাছে এটি বাইরের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ক্ষমতা। এই শোক তাই নিছক ধর্মীয় আচার নয়, বরং সমাজ নিজেই নতুন নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠার এক জীবন্ত ঘোষণা। সাম্রাজ্যবাদ যেখানে ভয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়, সেখানে এই সংহতি শোককে শক্তিতে রূপান্তর করছে।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংকট এই জানাজার মাধ্যমে প্রকট হয়েছে। গ্লোবাল সাউথের কাছে নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে হওয়ায় তাদের আস্থা কমছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তেহরানে উপস্থিত হয়ে সেই নেতাকে সম্মান জানাচ্ছেন, যাঁকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করেছে—এটি কোনো দ্বিচারিতা নয়, বরং বহুমুখী বিশ্বের নতুন বাস্তবতা। নাজাফ ও কারবালা হয়ে শেষযাত্রার পথটি স্থানীয় রাজনীতিকদের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয়েছে, যা স্পষ্ট করে দেয় যে প্রতিরোধ কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা বা একক নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়। খামেনির এই বিদায় তাই দেখিয়ে দেয় যে, বিশ্ব এখন আর একই দৃষ্টিভঙ্গির পৃথিবীতে বাস করছে না।