কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপে প্রায় ১৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সড়ক ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের তিন বছরের মাথায় বড় ধরনের ভাঙনের কবলে পড়েছে। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের প্রচণ্ড ধাক্কায় বাঁধের বিভিন্ন অংশের সিসি ব্লক সরে যাচ্ছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে এই পরিস্থিতির কারণে দ্বীপের পশ্চিমপাড়া, মাঝের পাড়া, দক্ষিণপাড়া ও ঘোলাপাড়ার অন্তত ৪০০ বসতবাড়ি সাগরগর্ভে বিলীনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়া অংশের এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়েছিল। এরপর ২০২০ সালে এক কিলোমিটারসহ মোট দুই কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার ও মেরামত করা হলেও তা স্থায়ী হয়নি। প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ওই সংস্কারের পরও শাহপরীর দ্বীপ, নয়াপাড়া-কাটাবুনিয়া এলাকা দিয়ে জোয়ারের পানি নিয়মিত ঢুকত। পরে ২০২২ সালে প্রায় ১৫১ কোটি টাকা ব্যয় করে ৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ওপর এই সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করা হয়।
দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী, শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকের অন্তত সাত কিলোমিটার বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত এবং পূর্ব দিকে আরও পাঁচ কিলোমিটার নাফ নদীর তীরবর্তী। সরেজমিনে দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের ধাক্কায় সীমান্ত সড়কের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। বেড়িবাঁধ রক্ষার জন্য পশ্চিম অংশে বাঁধের ঢালুতে সিসি ব্লক বসানো হয়েছিল, কিন্তু এখন সিসি ব্লকের নিচের মাটি ধসে গিয়ে ব্লকগুলো সরে যাচ্ছে। এতে ঢেউ সরাসরি মাটির বাঁধে আঘাত করছে। বেড়িবাঁধের ভেতরে পশ্চিমপাড়া, মাঝের পাড়া, দক্ষিণপাড়া ও ঘোলাপাড়াতে রয়েছে দুই হাজারের বেশি ঘরবাড়ি।
দ্বীপের বাজারপাড়ার বাসিন্দা ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কলিম উল্লাহ বলেন, ১৯৯০ সালেও শাহপরীর দ্বীপের দৈর্ঘ্য ছিল ১৪ কিলোমিটার আর প্রস্থ ৯ কিলোমিটার এবং লোকসংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার। সাগরে বিলীন হতে হতে এখন দ্বীপটির দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৩ কিলোমিটারে। তিনি জানান, দ্বীপের পশ্চিম ও দক্ষিণাংশে প্যারাবন সৃষ্টির সুযোগ না থাকায় সাগরের ঢেউ সরাসরি বেড়িবাঁধে আঘাত হানছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরের পানির উচ্চতা বাড়ায় জোয়ারের পানি বাঁধ উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। তিনি বাঁধের উচ্চতা আরও অন্তত চার ফুট বাড়ানোর দাবি জানান।
স্থানীয় জেলে বশির আহমদ (৫৫) জানান, ১৯৯১ সালে তাঁর বাড়ি ছিল সাগরের মধ্যে ৭০০ মিটার দূরে। গত তিন দশকে তাঁকে চারবার বসতবাড়ি সরাতে হয়েছে। বর্তমানে ঢেউয়ের আঘাতে তাঁর বাড়ির পাশে সিসি ব্লক উপড়ে পড়ছে, যা বিশাল আকারের হওয়ায় পুনরায় স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। মাঝেরপাড়ার জেলে সুলতান আহমদ জানান, ভাঙনের কারণে ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) টেকনাফের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী রিফাত ইবনে রশিদ জানান, বৈরী পরিবেশে বঙ্গোপসাগর প্রচণ্ড উত্তাল থাকায় সিসি ব্লক উপড়ে পড়ছে। পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ২৫ জুলাই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের কাজ সংস্কারের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পাউবো কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, লোকালয়ে সাগরের পানি ঢোকা ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে মেরামতের কাজ শুরু হবে। তবে সাগর শান্ত হলে নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে স্থায়ী সংস্কারকাজ শুরু করা হবে, কারণ উত্তাল পরিস্থিতিতে কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ।
পাউবোর তথ্যমতে, ২০১৬ সালে শাহপরীর দ্বীপের ২ দশমিক ৬৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য প্রায় ১৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ২০১৭ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০২২ সালের জুন মাসে শেষ হয়। এর আগে ভাঙা বাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপ সড়কের হারিয়াখালী থেকে উত্তরপাড়া পর্যন্ত চার কিলোমিটার পাকা সড়ক ভেঙে গিয়েছিল। ২০১৮ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) ৬৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভাঙা সড়কের ৫ দশমিক ১৫ কিলোমিটার পুনরায় নির্মাণ করে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বর্তমানে সেই সড়কটিও নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

