সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক ছিলেন মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেন। দীর্ঘ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে পালিয়ে থাকার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি বিশেষ দল তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। ডিএমপির ১৬ জুলাই প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বনানীর একটি বাসা থেকে মোজাফফরকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে জানানো হয় এবং পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসে মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ডিবি সূত্র জানায়, ঘটনার পর প্রথম কয়েক বছর দেশে আত্মগোপনে থাকলেও পরবর্তীতে তিনি ভারতে চলে যান। সেখানে ছদ্মনাম ব্যবহার করে বসবাস করতেন এবং বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে যাতায়াত করতেন। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি নিয়মিত পরিচয় ও বাসস্থান পরিবর্তন করতেন। সম্প্রতি গোয়েন্দারা নিশ্চিত হন যে মোজাফফর রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসায় অবস্থান করছেন। তাকে শনাক্ত করার জন্য গোয়েন্দারা দুটি প্রধান সূত্র ব্যবহার করেন—প্রথমত, তার মেয়ের কর্মস্থল, যিনি একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠান এয়ারটেলে কর্মরত ছিলেন এবং দ্বিতীয়ত, তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করে তার নাকের নিচে থাকা একটি বড় তিল বা আঁচিল। চেহারা পরিবর্তন করলেও এই জন্ম চিহ্নটি পরিবর্তনের সুযোগ তার ছিল না।
কয়েক মাস ধরে ডিবির বিশেষ দলটি মেয়ের কর্মস্থল ও চলাচল পর্যবেক্ষণ করে সম্ভাব্য বাসার ঠিকানা চিহ্নিত করে। এরপর গোয়েন্দারা ছদ্মবেশে ওই এলাকায় নজরদারি শুরু করেন এবং মোজাফফরের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন। বুধবার গভীর রাতে ডিবি কর্মকর্তারা ছদ্মবেশে ওই বাসার দরজায় কড়া নাড়েন। দরজা খোলার পর গোয়েন্দারা সরাসরি কোনো অভিযান বা গ্রেপ্তারবিষয়ক ভয়ভীতি না দেখিয়ে অতিথির মতো স্বাভাবিক আচরণ করেন। তারা মেয়ের নাম ধরে জানতে চান সে বাসায় আছে কিনা এবং নিজেদের ‘এয়ারটেল অফিস’ থেকে আসা কর্মী হিসাবে পরিচয় দেন। এত রাতে অফিসের লোক আসায় বাসার ভেতর থেকে একজন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি দরজা খুলে এগিয়ে এসে জানতে চান, ‘এত রাতে অফিসের কাজ কেন? আমাকে বলুন কী বিষয়।’
গোয়েন্দারা তখন কৌশলগতভাবে ওই বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটির চেহারা পর্যবেক্ষণ করেন। বাড়ির অল্প আলোতেও কর্মকর্তাদের চোখ এড়ায়নি তার নাকের নিচে থাকা সেই পরিচিত তিল বা আঁচিলটি। এ সময় কর্মকর্তারা বলেন, ‘মুরব্বি, আমরা তো আপনাকে চিনি না, আপনি কে? আমরা যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, তার সঙ্গে দেখা করতে দিন।’ সরল বিশ্বাসে এবং কিছুটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেই ব্যক্তি উত্তর দেন, ‘আমি মোজাফফর। মেয়ের বাবা’। মুখ থেকে একথা শোনার পর আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেনি ডিবির চৌকশ দল। পলকের মধ্যে পকেট থেকে বের হয়ে আসে হ্যান্ডকাফ এবং দীর্ঘদিনের ছদ্মবেশী ও সুচতুর পলাতক আসামির হাতজোড়া অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে আইনের খাঁচায়।

