দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের ওমর ফারুক ও মর্জিনা বেগমের বড় সন্তান হাফেজ মো. সুমন পাটোয়ারী (২১) ঢাকায় এসেছিলেন পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করতে। ভ্যানচালক বাবার কষ্ট লাঘবের স্বপ্ন নিয়ে তিনি একটি গার্মেন্টসে চাকরিও শুরু করেছিলেন। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়ে সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল; প্রাণ হারিয়ে লাশ হয়ে ফিরতে হলো তাকে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ওইদিন সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পর সুমনের বাবা ওমর ফারুকের ফোনে একটি কল আসে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, সকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় গুলিতে নিহত হয়েছেন সুমন। সংবাদ পাওয়ার পর ওই রাতেই ওমর ফারুক স্বজন আব্দুল খালেককে সঙ্গে নিয়ে মাইক্রোবাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ৬ আগস্ট ভোরে তারা ঢাকায় পৌঁছান এবং আশুলিয়া থানায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে ছেলের মরদেহ গ্রহণ করেন। ওইদিন রাতেই এশার নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে সুমনের দাফন সম্পন্ন হয়।
সুমনের সহপাঠী রুরেল জানান, ৩ আগস্ট গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সুমনসহ তারা আন্দোলনে যোগ দেন। ৫ আগস্ট সকালে তারা গাজীপুর-ঢাকা মহাসড়কের বাইপাইল এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেন। সেখানে হামলার এক পর্যায়ে সুমনসহ অনেকে গুলিবিদ্ধ হন। রুরেল জানান, সুমনকে না পেয়ে খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সড়কের পাশে তার রক্তাক্ত মরদেহ পাওয়া যায়। সে সময় পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে পুলিশের একটি ভ্যান তার মরদেহ উদ্ধার করে আশুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সুমনের মা মর্জিনা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, "আমার ছেলে সর্বশেষ এক মাস আগে ঢাকায় গিয়েছিল। যাওয়ার সময় বলেছিল, বাবা অসুস্থ মানুষ, তিনি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগী। বাবা যেন বেশি পরিশ্রম না করেন। ঢাকা থেকে এসে বাবাকে ভালো ডাক্তার দেখাবে বলেছিল। কিন্তু বাবার চিকিৎসা করানোর আগেই সুমন চলে গেল।"
সুমনের ছোট বোন উর্মি ও ছোট ভাই শিহাব জানান, ঢাকা যাওয়ার সময় সুমন তাদের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই ভাই এখন আর নেই। সুমনের বাবা ওমর ফারুক বলেন, "আমার ছেলে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করতে চেয়েছিল। তার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এখন আমার একটাই দাবি—যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের সুষ্ঠু বিচার চাই।"

