অক্সফোর্ড ইউনিয়নে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সেমিনারে উত্তেজনা, বাইরে সংঘর্ষে আ.লীগ কর্মীদের তাণ্ডব

যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী অক্সফোর্ড ইউনিয়নে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বিষয়ক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় বাইরে চরম বিশৃঙ্খলা ও তাণ্ডব সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছে দেশ থেকে বিতাড়িত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। তবে পুলিশ এবং বিপ্লবপন্থী ছাত্র-জনতার দৃঢ় অবস্থানের কারণে তাদের এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান দুই মুখ হাসনাত আবদুল্লাহ ও সাদিক কায়েম যখন সেমিনারের ভেতরে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বাইরে সেন্ট মাইকেলস স্ট্রিটে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

গতকাল স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটির উদ্যোগে ‘ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থান এবং উত্তর-বিপ্লবী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শিরোনামে এই গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনা শুরু হয়। এতে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। এছাড়াও জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা ও ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমও মূল বক্তা হিসেবে অংশ নেন।

অক্সফোর্ড ইউনিয়ন এই আয়োজনকে ‘বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লব এবং গণতন্ত্রে রূপান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে একটি সময়োপযোগী ও শক্তিশালী আলোচনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সেমিনারের ভেতরে বক্তারা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ এবং কীভাবে এই অভ্যুত্থান দেশের জাতীয় রাজনীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে, তা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেন।

বাইরে আওয়ামী লীগের তাণ্ডব ও প্রতিরোধ

ভেতরে যখন আলোচনা চলছিল, তখন বাইরে সেন্ট মাইকেলস স্ট্রিটে লন্ডন থেকে আসা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা উস্কানিমূলক স্লোগান দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংবাদপত্র ‘চেরওয়েল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে প্রায় ৪০০ জন বিক্ষোভকারী ও পাল্টা-বিক্ষোভকারী মুখোমুখি অবস্থানে জড়ো হয়েছিলেন।

বাংলাদেশে গত ২০২৫ সালের মে মাস থেকে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের এই কর্মীরা একটি দোতলা বাসে করে লন্ডন থেকে অক্সফোর্ডে এসে এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সংবলিত ব্যানার হাতে নিয়ে তারা “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান দিতে থাকে।

তবে সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত থাকা ইনকিলাব মঞ্চ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর বিপ্লবী নেতা-কর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তারা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ এবং ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগানে চারপাশ মুখরিত করে তোলেন এবং আওয়ামী লীগের তাণ্ডব রুখে দিতে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ঘটনাস্থলে চারটি পুলিশ ভ্যান ও দুটি পুলিশ কারসহ বিপুল সংখ্যক ব্রিটিশ পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ লাইনের মাধ্যমে দুই পক্ষকে আলাদা করার চেষ্টা করা হলেও পুরো সন্ধ্যা জুড়েই দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় উত্তেজনা ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে।

সেমিনার শেষে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা

সন্ধ্যা সাড়ে ৮টার দিকে অনুষ্ঠান শেষ হলে পুলিশ আওয়ামী লীগের বিক্ষোভকারীদের সেন্ট মাইকেলস স্ট্রিট থেকে সরিয়ে তাদের বাসের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে। তবে যাওয়ার পথেও আ.লীগ কর্মীরা তাদের সহিংস রূপ প্রদর্শন করে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, বাসে ওঠার আগে অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়ামের সামনে আবারও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সেখানে সেমিনার থেকে বের হওয়া দুজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে লক্ষ্য করে আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা “রাজাকার” স্লোগান দেয় এবং আচমকা তাদের ওপর চড়াও হয়ে কিলঘুষি মারার চেষ্টা করে। তবে বিপ্লবী ছাত্রদের প্রতিরোধ এবং উপস্থিত ব্রিটিশ পুলিশের দ্রুত হস্তক্ষেপে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ আক্রমণকারীদের প্রতিহত করে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়।

অক্সফোর্ড ক্যাম্পাসে বিদ্যমান উত্তেজনা

অক্সফোর্ড ইউনিয়নের এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আগামী বুধবার যুক্তরাজ্যের উগ্র-ডানপন্থী ও বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব টমি রবিনসন (স্টিভেন ইয়াক্সলি-লেনন) এবং লরেন্স ফক্সের অক্সফোর্ডে বক্তব্য রাখার কথা রয়েছে। ওই আয়োজনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তার ওপর গতকাল বাংলাদেশ কেন্দ্রিক এই সংঘর্ষের ঘটনা অক্সফোর্ড ক্যাম্পাসজুড়ে বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।