বাংলাদেশে মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পূর্বে ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ফিলিস্তিন এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে আসতেন। তবে বর্তমানে এই ধারা পরিবর্তিত হচ্ছে।
ভারতের মণিপুর থেকে আসা হানজাবাম ধনরাজ শর্মা বর্তমানে বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজে শেষ বর্ষে পড়ছেন। তিনি জানান, ভারতে সরকারি মেডিক্যাল কলেজে সুযোগ পাওয়া কঠিন এবং বেসরকারি কলেজের খরচ বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশের পাঠ্যক্রম, কম দূরত্ব, সহজ ভাষা এবং তুলনামূলক কম খরচ বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার প্রধান কারণ ছিল। ধনরাজ বলেন, তিনি বাংলাদেশে কখনো অনিরাপদ বোধ করেননি, যদিও তার আত্মীয়স্বজনরা খবরের কাগজ ও সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে দুশ্চিন্তা করেন। ২০২৪ সালে দীপার এমবিবিএস শেষ হয়েছে।
সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীরা মূলত সার্ক ও নন-সার্ক কোটায় সুযোগ পান। প্রতি বছর এই কোটায় মোট ২২০ থেকে ২৬টি আসন বরাদ্দ থাকে। ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সার্ক কোটায় ১২৫ জন এবং নন–সার্ক কোটায় ৯৯ জনকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে, ভর্তির সুযোগ পেলেও সবাই ভর্তি হননি, তাই সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে মোট কতজন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ঢাকা, স্যার সলিমুল্লাহ, সিলেট এম এ জি ওসমানী, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি দেখা যায়।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. ফারুক আহাম্মদ জানিয়েছেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের থাকা, খাওয়া ও স্যানিটেশন সংক্রান্ত কিছু সমস্যার কথা তারা শুনেছেন এবং এ ব্যাপারে তারা আন্তরিক। সার্ক কোটায় বিভিন্ন দেশের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন বরাদ্দ থাকে। যেমন, এমবিবিএস কোর্সে ভারতের জন্য ২২টি, পাকিস্তানের জন্য ২১টি, নেপালের জন্য ১৯টি, শ্রীলঙ্কার জন্য ১৩টি, ভুটানের জন্য ২৮টি, মালদ্বীপের জন্য ৬টি এবং আফগানিস্তানের জন্য ৩টি আসন বরাদ্দ ছিল। নন-সার্ক কোটায় মিয়ানমার, ফিলিস্তিন ও অন্যান্য দেশের জন্য ৭২টি আসন এবং ডেন্টালের জন্য ৪০টি আসন রাখা হয়েছে।
পোস্টগ্র্যাজুয়েশনের জন্যেও অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে আসেন। নেপালের ডা. রাম সাগর শাহ বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক বিএসএমএমইউ) নিওনেটোলজিতে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে তিনি চট্টগ্রামের ইউএসটিসি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। এমবিবিএস শেষে নিজ দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। পোস্টগ্র্যাজুয়েশনের জন্য আবার বাংলাদেশে আসেন কারণ, এখানে সরাসরি নিওনেটোলজিতে পড়ার সুযোগ আছে এবং ভাষাটাও তার জানা। নেপালি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে তুলনামূলক ভালো ফলাফল করছেন; গত বছর ঢাকা মেডিকেল কলেজের নেপালি শিক্ষার্থী স্তুতি রিমাল এমবিবিএস চূড়ান্ত পরীক্ষায় সারা দেশে সেরা দশে স্থান করে নিয়েছিলেন।
দেশের ৬৮টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে অন্তত ৬০টিতেই নিয়মিত বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হন। সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ, ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ, গাজীপুরের ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহের কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লার ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ, রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বেসরকারি মেডিক্যালে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির একটি তালিকা পাওয়া গেল স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি মেডিক্যালগুলোতে প্রায় ১ হাজার ৭৪৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন। এই সংখ্যা বেড়ে ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষে ২ হাজার ১২ জন এবং ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষে ২ হাজার ৯৬ জন হয়েছিল। তবে ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষে তা কমে ১ হাজার ৬৬৯ জনে এবং ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে ১ হাজার ১৮৭ জনে দাঁড়ায়। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসাশিক্ষা) অধ্যাপক ডা. রুবীনা ইয়াসমীন নিশ্চিত করেছেন যে, গতবারের চেয়ে এবার বিদেশি শিক্ষার্থী সংখ্যা আরও কমেছে। তিনি বলেন, সরকারি মেডিক্যাল কলেজে বিদেশিদের জন্য বরাদ্দ আসন মোটামুটি ভরে গেলেও বেসরকারি মেডিক্যালগুলো আগের মতো শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ) এ বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে এবং অধিদপ্তরও সহায়তা করছে।
সরকারি মেডিক্যাল কলেজে নন–সার্ক কোটায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি বছর পাঁচ হাজার ডলার টিউশন ফি দিতে হয়, যা পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবনে প্রায় ২৫ হাজার ডলার। বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে এই খরচ প্রতিষ্ঠানভেদে ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এই খাতে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় সুযোগ রয়েছে।
বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রধান কারণ হিসেবে অনুমেয়। এছাড়া, নেপাল ও মালদ্বীপে চিকিৎসাবিদ্যা পড়ার সুযোগ বৃদ্ধি এবং রাশিয়া, চীনসহ অন্যান্য দেশে পড়ার ব্যবস্থা করা এজেন্সিগুলোর সক্রিয়তাও একটি কারণ। মালদ্বীপের শিক্ষার্থীরা এখন চীন, রাশিয়া বা মালয়েশিয়ায় পড়লেও ইন্টার্নশিপের জন্য বাংলাদেশে আসছেন। বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর মালদ্বীপের প্রায় দেড়শ শিক্ষার্থীকে সরকারি মেডিক্যালে বিনা খরচে ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেয়।
বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ) শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে পড়াশোনার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপের জন্যও আকৃষ্ট করতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। বিপিএমসিএর জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, তারা মালদ্বীপ ও নেপালে মেডিক্যাল এডুকেশন ফেয়ার করেছেন এবং এ বছর ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কাতেও ফেয়ার করার পরিকল্পনা আছে। তিনি মনে করেন, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশ থেকেও শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব, তবে শুধু শিক্ষার প্রচার নয়, দেশ হিসেবেও বাংলাদেশের মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিং প্রয়োজন।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই বছরে মেডিক্যাল কলেজগুলোয় বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।.২০১৯ সালে রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভুটানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং।
