আন্দোলনের চাপে পদত্যাগ করলেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ভুচিচ

দীর্ঘদিন ধরে চলমান ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করলেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার ভুচিচ। গত রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় তিনি নিজের পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। রাজধানী বেলগ্রেডের প্রেসিডেন্ট ভবনে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন। তার দায়িত্ব আগামী দিন সংসদের স্পিকার আনা ব্রনাবিচের কাছে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে, যিনি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি। সেটিকে সার্বিয়ার অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। ফলে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেও সার্বিয়ার রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে তার থাকার সুযোগ থাকছে।

ভুচিচ জানান, আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তিনি সাধারণ নাগরিক হিসেবে অংশগ্রহণ করতে চান। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা এই নেতা ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংবিধানের বাধ্যবাধকতার কারণে তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে না পারায়, তিনি তার দলের হয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে লড়াইয়ের পরিকল্পনা করেছেন। আগামী ২৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দেশটিতে আগাম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

দীর্ঘ ৯ বছরের শাসনামলে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় ছিল বলে দাবি করেছেন ভুচিচ। তবে তার সরকার শুরু থেকেই দুর্নীতির অভিযোগে বেশ চাপে ছিল। বিশেষ করে ২০২৪ সালে নভি সাদ রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় সরকারের দুর্নীতির বিষয়টি প্রকট হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজে নিয়ম না মেনে কেবল খরচ কমানোর লক্ষ্যেই অনিয়ম করা হয়েছিল। এই ঘটনার পর থেকেই ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক ও কৃষকরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন, যেখানে দেশসেরা টেনিস তারকা নোভাক জকোভিচও সমর্থন জানান। এই ঘটনাই সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ উসকে দেয়।

আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, স্টেশনটির সংস্কারে তৎকালীন সরকারের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল এবং এই দুর্ঘটনা তাদের দীর্ঘদিনের শাসনামলের ব্যর্থতার প্রতিফলন। গ্রীষ্মজুড়ে চলা এই বিক্ষোভ দমনে পুলিশের নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয়। জনগণের প্রবল ক্ষোভের মুখে ভুচিচের দলের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা পদত্যাগ করলেও আন্দোলন থামেনি। স্টেশনটির সংস্কারের সঙ্গে ভুচিচ নিজেকে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়েছিলেন।

পদত্যাগের আগে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতার ব্যবহার করে ভুচিচ ৪৯ জনকে ক্ষমা করেছেন। আরটিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষমা পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২৩ জন ছাত্র এবং তার দলের অনুগত কয়েকজন নেতাকর্মী রয়েছেন, যারা গত দেড় বছরের অস্থিরতাপূর্ণ বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ভুচিচ সংবিধানের দেওয়া ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ৪৯ জনকে ক্ষমা করেছেন। এরপর আন্দোলনে নামেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

আগামী নির্বাচনে ভুচিচের প্রোগ্রেসিভ পার্টি সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ‘স্টুডেন্টস উইন’ এবং বিরোধী জোট ‘ইউরোপীয় সার্বিয়া’র কাছে। ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেও, রাশিয়ার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ও চীনের বিপুল বিনিয়োগের কারণে ভুচিচের শাসনামল বরাবরই আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।