ইউরোপের দেশগুলোতে তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক বিক্ষোভ সরকার ও অভিজাত শ্রেণির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে জেন-জি প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরকারের কাছে কার্যকর সহায়তার দাবি জানাচ্ছেন। এই আন্দোলনের মূলে রয়েছে ক্রমবর্ধমান বাড়িভাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বল অবকাঠামো, কর্মসংস্থানের অভাব এবং জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয়। তরুণরা মনে করছেন, তাদের বাবা-মায়ের সময়ের তুলনায় বর্তমান যুগে স্থিতিশীল জীবন গড়া, মানসম্মত শিক্ষা পাওয়া ও আবাসন নিশ্চিত করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ। আমরা সবাই শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামগ্রিকভাবে তরুণ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলছি। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের অনেকে স্লোগান দিয়েছেন, “গ্রিস থেকে ফ্রান্স—আমরা চাই সবার জন্য উন্মুক্ত ও বিনামূল্যে শিক্ষা।”।
স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাস্কাল নামের এক নারীকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার ঘটনায় তরুণরা ক্ষুব্ধ হয়ে রাজপথে নেমে এসেছেন।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলন করছেন। এদিকে আলবেনিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দানা বেঁধেছে। ইতালির রোমে বসবাসরত শিক্ষার্থীরা জানান, আকাশচুম্বী ভাড়ার কারণে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই দুরূহ হয়ে পড়ছে। একই পরিস্থিতি পর্তুগালেও, যেখানে লিসবনে হাজার হাজার মানুষ সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে জড়ো হয়েছেন। এছাড়া ইতালি ও গ্রিসের শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে সরকারি শিক্ষার দাবিতেও সোচ্চার হয়েছেন। তাদের এ আন্দোলন রীতিমতো উদ্বিগ্ন করে তুলেছে এসব দেশের শাসক ও অভিজাতগোষ্ঠীকে।
ফ্রান্সের ছাত্র সংগঠন ‘ইউএনইএফ’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস ডি ব্রিটো সিএনএনকে বলেন, তরুণরা আজ যে পরিস্থিতির মুখোমুখি, তা সব দেশেই অভিন্ন। তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন সমস্যা নিরসনে সবাই ঐক্যবদ্ধ দাবি তুলছে। শিক্ষার্থীনেতা ব্রিটো আরও বলেন, গত নয় বছর ধরে শিক্ষার্থীরা এই দাবিগুলো জানিয়ে আসছে, কিন্তু এখন উত্তরের অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে তারা ক্লান্ত। বেলজিয়ামভিত্তিক দৈনিক ‘ইউরোপিয়ান করেসপন্ডেন্ট’-এর প্রধান সম্পাদক জুলিয়াস ফিনটেলম্যান মনে করেন, এই বিক্ষোভ সরকারের প্রতি তরুণদের চরম হতাশারই বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, ইউরোপের রাজনীতি পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে তরুণরা মনে করছেন।
আলবেনিয়ায় সম্প্রতি বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিলে প্রধানমন্ত্রী এদি রামা পদত্যাগের দাবি সরাসরি নাকচ করে দেন এবং এই উত্তেজনার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করেন। তবে বিক্ষোভকারীরা অনড়। রয়টার্সের সাথে আলাপকালে একজন বিক্ষোভকারী বলেন, তারা পরিবর্তনের প্রত্যাশায় রাস্তায় নেমেছেন এবং তারা দ্রুত একটি নতুন সরকার ও আমূল বিপ্লব চাইছেন। শ্রমবাজারে অস্থিরতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি নিয়েও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গভীর উদ্বেগ কাজ করছে। একজন বিক্ষোভকারী রয়টার্সকে বলেন, “আমরা পরিবর্তন চাই, আর সে কারণেই আমরা এখানে এসেছি। আমরা কোনো আলোচনার পথে যেতে চাই না; আমাদের যত দ্রুত সম্ভব একটি নতুন সরকার প্রয়োজন।
আন্দোলন আরও জোরালো করার পরিকল্পনা রয়েছে বিভিন্ন দেশে। জার্মানিতে ‘জেন জেড রেগেল্ট’ (জেন-জি সব সামলে নেবে) নামের একটি সংগঠন ৩১ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। স্পেনের বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন ১১ নভেম্বর সাধারণ ধর্মঘটের পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া ব্রিটেন ও ইতালির শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো ২০ নভেম্বর শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। রোমের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এলিসা পাস্তোরে সিএনএন-কে জানান, তিনি ও তার ভাই মিলে যে কক্ষে থাকেন, সেটির ভাড়া জোগাড় করতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়।

