ইউরোপের একাধিক দেশে অবস্থিত সুপারমার্কেটগুলোর ফ্রিজার ও শীতলীকরণ ব্যবস্থায় ভয়াবহ সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। হ্যাকাররা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এসব যন্ত্রের তাপমাত্রা মাইনাস ২৭ ডিগ্রি থেকে বাড়িয়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে তুলে দেয়। ২ নভেম্বর সোমবার রাতে শুরু হওয়া এই হামলায় মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য ও আইসক্রিমসহ প্রচুর তাজা ও হিমায়িত খাদ্যপণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। সুইডেন, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, আয়ারল্যান্ড ও এস্তোনিয়ার বিভিন্ন সুপারমার্কেট এই হামলার শিকার হয়েছে।
সুইডেনের সুপারমার্কেট চেইন আইসিএর মুখপাত্র গুস্তাফ নিলসন জানিয়েছেন, তাদের কয়েকটি শাখার হিমায়িত পণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেয়। দেশটির শ্যোবো এলাকার আইসিএ কোয়ান্টাম শাখার ফ্রিজারগুলোর তাপমাত্রা হ্যাকাররা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত করেছিল। এছাড়া সুইডেনের আরেক চেইন কুপের ছয়টি দোকানেও একই ধরনের সমস্যা শনাক্ত হয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলো থেকে নিরাপত্তাঝুঁকিতে থাকা খাবার সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।
বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গে ডাচ মালিকানাধীন সুপারমার্কেট চেইন আহোল্ড ডেলহাইজের কয়েক ডজন দোকানের শীতলীকরণ ব্যবস্থা হ্যাকারদের কবলে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র সারাহ ডি মিস্টার নিশ্চিত করেছেন যে, তথ্যপ্রযুক্তিগত এই হামলার কারণে ফ্রিজারের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তাদের তাজা পণ্যের সরবরাহ সীমিত করতে হয়েছে। তবে তাদের বিতরণকেন্দ্রগুলো অক্ষত রয়েছে। এছাড়া বেলজিয়ামের ক্যারেফোর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের সাত শতাধিক দোকানের মধ্যে ১৫টি আক্রান্ত হয়েছে এবং একটি মাংসের দোকানের প্রায় ১৫ হাজার ইউরো মূল্যের মাংস নষ্ট হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সামগ্রিক কার্যক্রমে এর প্রভাব সীমিত ছিল। প্রাথমিকভাবে এটিকে তথ্যপ্রযুক্তিগত ত্রুটি মনে করা হলেও পরবর্তী সময়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সাইবার হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
আয়ারল্যান্ডের সুপারভ্যালু চেইনের ১৩টি দোকানেও একই ধরনের শীতলীকরণ সমস্যার কথা জানা গেছে। এস্তোনিয়ার কিটম্যান কোল্ডটেক জানিয়েছে, হ্যাকাররা নিয়ন্ত্রণকারী কম্পিউটারে প্রবেশ করে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নিয়ে গিয়েছিল। দেশটির সেলভার সুপারমার্কেট চেইনের একটি শাখাও এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রযুক্তিবিদদের মতে, আধুনিক সুপারমার্কেটের ইন্টারনেট-সংযুক্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা যথাযথ নিরাপত্তা ছাড়া পরিচালনা করলে তা এমন সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে। তবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। ফ্রান্সের প্রায় ৭০০ সুপারমার্কেট এ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও ফ্রিজারগুলো সাধারণত ইন্টারনেট-সংযুক্ত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
এর আগে অক্টোবরে ফ্রান্সে প্রায় সাত শ সুপারমার্কেটে একইভাবে সাইবার হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় কয়েক কোটি ইউরোর আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। ইউরোপের বর্তমান ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে সুইডেনের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্রসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ তদন্ত চালাচ্ছে। একইসঙ্গে শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত পুরনো সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং এবিসি নিউজসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুসারে, ঘটনার শিকার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। তদন্ত চলাকালীন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট-সংযুক্ত যন্ত্রপাতি ও বাণিজ্যিক সফটওয়্যারের ঝুঁকিগুলো নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে।

