জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব কেবল প্রকৃতির ভারসাম্যই নষ্ট করছে না, বরং ইতিহাসের লুকানো অধ্যায়গুলোকেও নতুন করে সামনে নিয়ে আসছে। উত্তপ্ত পৃথিবীর প্রভাবে ইতালির বিখ্যাত ডলোমাইটস অঞ্চলের বরফস্তর দ্রুত গলে যাচ্ছে, যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে চাপা পড়ে থাকা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আমলের প্রায় আড়াইশ অবিস্ফোরিত বোমা ও গোলাবারুদ বেরিয়ে আসছে। সম্প্রতি ইতালীয় সেনাবাহিনী এই অঞ্চল থেকে এসব তাজা বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে। জায়দুল হক সোহেল, ইতালি জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব এখন কেবল প্রকৃতিতেই নয়, দৃশ্যমান হচ্ছে ইতিহাসের পাতায়ও। আর সেই বরফ গলতেই বেরিয়ে আসছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ সব স্মৃতি। ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় ডলোমাইটস ও আল্পস পর্বতমালা অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত কয়েক বছরে তুষার গলার গতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেসময় বরফের নিচে হারিয়ে যাওয়া সেইসব সামরিক রসদ ও অস্ত্রশস্ত্রই এখন বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বরফ গলে দীর্ঘ এক শতাব্দী পর মাটির উপরে বেরিয়ে আসছে।
উদ্ধার অভিযানের সময় সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে উচ্চ-উচ্চতার হিমবাহ থেকে একে একে এসব বিস্ফোরক সরিয়ে নেন। অভিযানে ১৮টি ইতালীয় ৭৫ মিলিমিটার আর্টিলারি শেল এবং ৩৭টি ফরাসি প্রযুক্তির থ্যাভোটোট মোর্টার শেলসহ প্রায় আড়াইশ শক্তিশালী বিস্ফোরক সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। ১৯১৫ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আল্পস পর্বতমালা এলাকায় ইতালি এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যা ইতিহাসে ‘হোয়াইট ওয়ার’ বা সাদা যুদ্ধ নামে পরিচিত। সেই সময় মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে তুষারঝড় ও বরফের নিচে চাপা পড়ে হাজার হাজার সৈন্য প্রাণ হারিয়েছিলেন। পাহাড়ের কোলঘেঁষা বরফের সাদা চাদর ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ। গ্রীষ্মকালে যখন পাহাড়ি বরফের স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে যায়, তখন এখানকার পরিচিত ট্রেইল বা হাইকিং রুটগুলো দৃশ্যমান হয়। শতবর্ষ পুরোনো হলেও এগুলোতে মরিচা পড়লেও এর ভেতরে থাকা বারুদ ও বিস্ফোরক উপাদানগুলো ছিল অত্যন্ত সক্রিয় এবং বিপজ্জনক। ১৯১৫ থেকে ১৯১৮ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ইতালি এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের মধ্যে এই আল্পস পর্বতমালা অঞ্চলে এক রক্তক্ষয়ী ও তীব্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যা ইতিহাসে ‘হোয়াইট ওয়ার’ (The White War) নামে পরিচিত। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত তল্লাশি চালাতে মাঠে নামানো হয় ইতালীয় সেনাবাহিনীর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাহাড়ি দল ‘জুলিয়া আল্পাইন ব্রিগেড’ এবং বোম ডিসপোজাল স্কোয়াডকে।
এসব পুরোনো অস্ত্রের সন্ধান পাওয়ার পর থেকে ইতালীয় কর্তৃপক্ষ ও উদ্ধারকারী দলগুলো ডলোমাইটস অঞ্চলে চলাচলকারী হাইকার ও পর্যটকদের জন্য কড়া সতর্কবার্তা জারি করেছে। পাহাড়ি ট্রেইলে যাতায়াতের সময় যদি কোনো সন্দেহজনক ধাতব বস্তু বা পুরোনো অস্ত্রের উপস্থিতি চোখে পড়ে, তবে সেগুলোতে স্পর্শ না করে অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বোসনিয়ায় একটি ইতালীয় সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু এবং বারো জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, চার দিনের জাপান সফর শেষে আজ রাতে দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী। বোসনিয়ায় ইতালীয় সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত: নিহত ৩, আহত ১২। চলতি মৌসুমে স্থানীয় পর্বতারোহী ও পর্যটকরা ডলোমাইটস ও সংলগ্ন উপত্যকাগুলোতে হাঁটার সময় বরফের বুক চিরে বেরিয়ে থাকা অচেনা ধাতব বস্তু এবং সামরিক সরঞ্জাম দেখতে পান। পর্যটকরা বিষয়টি বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দেন। খবর পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসে ইতালীয় প্রশাসন।

