এমপি আজিজের আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল

নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর নামে ছড়িয়ে পড়া তিনটি কথিত আপত্তিকর ভিডিও নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। একই সময়ে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় তাঁর ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর গ্রেফতার ও রিমান্ডের ঘটনায় স্থানীয় রাজনীতিতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

বুধবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলার বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। কেউ কেউ দল ও সংসদ থেকে তাঁর বহিষ্কার এবং পদত্যাগের দাবিও তোলেন।

ভাইরাল ভিডিও নিয়ে সংসদ সদস্যের বক্তব্য

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভিডিওগুলোতে সংসদ সদস্যের উপস্থিতি রয়েছে বলে দাবি করা হলেও সেগুলোর সত্যতা ও উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ ভিডিওগুলোকে বানোয়াট বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করেও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব।

এদিকে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের একাধিক নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কয়েকজন দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ঘোষণাও দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বড়াইগ্রামের বনপাড়া বাইপাসসহ বিভিন্ন স্থানে সংসদ সদস্যের ছবি সংবলিত বিলবোর্ড ভাঙচুরের ঘটনাও সামনে এসেছে।

নাটোর জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, একজন সংসদ সদস্য দেশের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

নাটোর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, দলের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ উঠলে সাংগঠনিকভাবে তা বিবেচনা করা হবে। চলতি মাসে আহ্বায়ক কমিটির সভায় সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের বিষয়টি আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যা মামলায় এমপিপুত্র রিমান্ডে

সংসদ সদস্যকে ঘিরে বিতর্কের পাশাপাশি তাঁর ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর বিরুদ্ধে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যা মামলাও আলোচনায় রয়েছে। এ ঘটনায় মিন্টুকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়কের পদসহ দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কারের কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় যুবদল।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা কয়েকজনের সশস্ত্র হামলায় আহত হন ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম (৩২)। ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৬ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

শাকিলের বাবা রবিউল মিস্ত্রির করা হত্যাচেষ্টা মামলার পর পুলিশ সোমবার রাতে নুরুজ্জামান মিন্টুকে আটক করে। পরে তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তবে মামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার দাবি, সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের দুই ছেলের পৃথক সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। নিহত শাকিল ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগের অনুসারী ছিলেন বলে তাঁদের বক্তব্য। অন্যদিকে নুরুজ্জামান মিন্টু উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। দুই ভাইয়ের সমর্থকদের মধ্যে বিরোধ থেকেই এ ঘটনা ঘটতে পারে বলে তাঁদের ধারণা। তবে এ বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল জানা যায়নি।

কেন্দ্রীয় যুবদলের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সহযোদ্ধার প্রাণহানির মতো গুরুতর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নুরুজ্জামান মিন্টুকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এদিকে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নানকে প্রত্যাহার করে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

জানাজায় ক্ষোভ, সংসদ সদস্যকে ঘিরে স্লোগান

শাকিল হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি ঘিরে এলাকায় ক্ষোভ আরও বাড়ে। নিহতের বাবা রবিউল মিস্ত্রির অভিযোগ, তাঁর ছেলেকে কুপিয়ে আহত করার পর মামলার এজাহারে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রাসেল হোসাইনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পরে সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের নির্দেশে ওই নাম বাদ দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ধারণা, মিন্টুর পাশাপাশি রাসেলও এ ঘটনায় জড়িত। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্য তদন্তসাপেক্ষ।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে গুরুদাসপুর সরকারি কলেজ মাঠে শাকিলের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ উপস্থিত ছিলেন।

জানাজায় বক্তব্য দেওয়ার সময় নিহতের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন আব্দুল আজিজ। তবে এ সময় উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে তাঁকে উদ্দেশ্য করে ‘ভুয়া’ স্লোগান দেন। এতে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

জানাজা শেষে রাত ১১টার দিকে একদল লোক মিছিল নিয়ে চাঁচকৈড় বাজারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রাসেল হোসাইনের ‘রাস আরবান স্টাইল’ নামের শপিংমলে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনাটি সম্পর্কে নাটোরের জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার বলেন, কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি মব সৃষ্টি করে একজন প্রবাসীর ক্ষতিসাধন করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারের দাবিতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ

শাকিল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিচারের দাবিতে বুধবার বিকেলে নাটোর জেলা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।

একদিকে ছাত্রদল নেতা হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিচার ও জবাবদিহির দাবি, অন্যদিকে সংসদ সদস্যকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে বিতর্ক— সব মিলিয়ে নাটোর-৪ আসনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন উত্তপ্ত। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাই এবং হত্যা মামলার অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তির জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।