ইরানি নির্মাতা জাফর পানাহিকে নতুন মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড

কান চলচ্চিত্র উৎসবের স্বর্ণপামজয়ী প্রখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহিকে আবারও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তেহরানের একটি আদালত তাঁকে নতুন একটি মামলায় পাঁচ বছর এক মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেছেন। কেবল কারাদণ্ডই নয়, একই সঙ্গে তাঁর সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী দুই বছরের জন্য তাঁর বিদেশ ভ্রমণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। গত বছর রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার দায়ে এক বছরের কারাদণ্ড পাওয়ার পর এই নতুন রায় ৬৬ বছর বয়সী পানাহির জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন রায়ের ফলে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন ৬৬ বছর বয়সী পানাহি। বুধবার (২৮ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও মার্কিন সাময়িকী ভ্যারাইটি পৃথক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। নতুন কারাদণ্ড সেই কণ্ঠ রুদ্ধ করার আরেকটি চেষ্টা।

পানাহির আইনজীবী মোস্তফা নিলি জানিয়েছেন, কোনো ধরনের শুনানির তারিখ না জানিয়েই বা পানাহির উপস্থিতিতে ছাড়াই আদালত এই রায় ঘোষণা করেছেন। বিষয়টি জানাজানি হয় গত সপ্তাহে, যখন হঠাৎ করে পানাহির ব্যাংক হিসাবগুলো জব্দ করা হয়। এরপর আইনজীবী ও নির্মাতা প্রসিকিউটরের দপ্তরে খোঁজ নিয়ে এই দণ্ডাদেশের বিষয়টি জানতে পারেন। ভ্যারাইটির তথ্যমতে, আদালতের নথিতে পানাহিকে ইরানের বাইরে বসবাসকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে, যদিও তিনি চলতি বছরের ৩০ মার্চ ইরানে ফিরে এসেছিলেন। বর্তমানে পানাহির বিরুদ্ধে তিনটি মামলা বিচারিক প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং নতুন রায়ের পাশাপাশি আগের এক বছরের কারাদণ্ডটিও বহাল আছে। তবে এই সাজাগুলো কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে কোনো স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়নি। ইউরোপে অবস্থানরত তাঁর এক বন্ধুর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, সোমবার পর্যন্ত পানাহিকে আটক করার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি শুনানির তারিখ সম্পর্কেও পানাহিকে আগে জানানো হয়নি। এরপর প্রতিশোধ, ন্যায়বিচার ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যায় কাহিনি।

নতুন রায়ে সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিষয়টি নিয়ে আইনজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন। মানবাধিকার আইনজীবী মইন খাজায়েলি উল্লেখ করেছেন, সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি ছাড়া এমন বাজেয়াপ্তের নির্দেশ ইরানের সংবিধানের পরিপন্থী হতে পারে। চলচ্চিত্র অঙ্গনের শিল্পীরাও পানাহির পাশে দাঁড়িয়েছেন। অভিনেত্রী সেতারেহ মালেকি বলেন, পানাহির মতো মেধাবী নির্মাতাদের কাজ যখন সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়, তখনই তা কর্তৃপক্ষের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া নাজানিন বনিয়াদি এই রায়কে নির্মাতার কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইরানের অধিকারকর্মীদের আইনি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান দাদবানের মানবাধিকার আইনজীবী মইন খাজায়েলি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, সম্পত্তির সঙ্গে অভিযোগের সুস্পষ্ট আইনগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা না গেলে এ ধরনের বাজেয়াপ্তের নির্দেশ ইরানের সংবিধান লঙ্ঘন করতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন চলতে থাকলে সহিংসতার চক্র থেকে বেরিয়ে আসা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

জাফর পানাহি দীর্ঘকাল ধরে দেশটির রক্ষণশীল কর্তৃপক্ষের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছেন। ২০১০ সালে তাঁর ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণ, বিদেশ ভ্রমণ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে তিনি গোপনে ‘দিস ইজ নট আ ফিল্ম’, ‘ট্যাক্সি’ ও ‘নো বেয়ার্স’-এর মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ২০১৫ সালে বার্লিন উৎসবে স্বর্ণভালুক এবং ২০১৮ সালে কানে চিত্রনাট্য পুরস্কার জিতেছেন তিনি। ২০২২ সালের জুলাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি কারাবন্দী ছিলেন। এরপর ২০২৫ সালে ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’ চলচ্চিত্রের জন্য কান উৎসবে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি স্বর্ণপাম জয় করেন। কারাবাসের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত এই সিনেমাটি ৯৮তম অস্কারে সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্ব করে মনোনয়ন পেয়েছিল। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে পানাহি নিজের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ইরানের মানুষের দুর্ভোগ ও প্রতিরোধের কথা তুলে ধরেছেন। ইরানের জাফর পানাহি টাইম ম্যাগাজিনের প্রভাবশালীর তালিকায়। ২০২২ সালের জুলাইয়ে ইরানের কয়েকজন নির্মাতার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ ঘিরে পানাহি নিজেও গ্রেপ্তার হন। প্রায় সাত মাস কারাবন্দী থাকার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে জামিনে মুক্তি পান তিনি। কয়েকজন সাবেক রাজনৈতিক বন্দী এক ব্যক্তিকে তাঁদের ওপর নির্যাতন চালানো কারারক্ষী বলে সন্দেহ করেন।

এর আগে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পানাহিকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়টি জানা থাকা সত্ত্বেও চলতি বছরের মার্চে তিনি আন্তর্জাতিক প্রচারণার কাজ শেষ করে ইরানে ফিরে আসেন। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, নিজের দেশের মাটিতে কাজ করতেই তিনি বেশি আগ্রহী। চলতি বছরের শুরুতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানের সহিংস পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমানে সর্বশেষ এই দণ্ডাদেশ তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্র নির্মাণের পথকে আরও সংকীর্ণ করে তুলছে। তবে অভিযুক্ত মামলার সুনির্দিষ্ট অপরাধ বা সাজা কার্যকরের সময়সীমা নিয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো ঘোষণা আসেনি। কারাদণ্ড মাথায় নিয়েই দেশে ফিরেছিলেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে পানাহিকে এক বছরের কারাদণ্ড দেন ইরানের আদালত। দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে এর আগে ভ্যারাইটিকে জানিয়েছিলেন, নিজের দেশেই থাকতে ও কাজ করতে চান তিনি।