জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে কুষ্টিয়ায় ছয়জন ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া একই মামলায় দলটির আরও তিন নেতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এরপর কাকে কী দণ্ড দেওয়া হয়েছে, তা ঘোষণা করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় প্রদান করেন। প্যানেলের অন্য দুই বিচারক হলেন মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায় অনুযায়ী, দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। মামলার চার আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। এর আগে ২৩ এপ্রিল ১৯ জন সাক্ষীর জেরা শেষ হয় এবং ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে চিপ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটররা অংশ নেন এবং পলাতক আসামিদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন আইনি লড়াই করেন। ট্রাইব্যুনালে চিপ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, জহিরুল আমিনসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর উপস্থিত ছিলেন। গত ৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি-পাল্টা যুক্তি খণ্ডন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে, ১০ জুন যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রপক্ষ অতিরিক্ত প্রমাণাদি দাখিল করায় পুনরায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। ২৩ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার মধ্য দিয়ে মামলায় ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। পরদিন ৬ অক্টোবর অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়, জুলাই আন্দোলন দমনে ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হানিফ উসকানি ও প্ররোচনা দিয়েছিলেন। বিশেষ করে ১৫, ১৭ ও ৩০ জুলাই এবং ৩ আগস্ট বিভিন্ন সভায় তার দেওয়া বক্তব্য আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে উৎসাহিত করে। দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে বৈঠক করে হানিফের নেতৃত্বে স্থানীয় নেতারা আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে ২৭ অক্টোবর রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিন ধার্য করা হয়। এছাড়া ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যে আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলন দমনে হত্যা-নির্যাতনের উসকানি, প্ররোচনা-সহায়তা দেন এই শীর্ষ নেতা।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ছয়জনকে হত্যার ঘটনা ঘিরে। সেদিন সকাল ১০টার দিকে ছাত্র-জনতা শান্তিপূর্ণভাবে শহরের হাসপাতাল মোড় থেকে মজমপুর অভিমুখে যাত্রা শুরু করলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর গুলি চালায়। প্রসিকিউশনের দাবি, এ সময় পুলিশ হামলাকারীদের ছত্রছায়া দেয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে একযোগে গুলি চালানো হয়।
ঘটনার বিবরণে দেখা যায়, ৫ আগস্ট দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল চারটার মধ্যে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে এ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ। তদন্তে উঠে এসেছে যে, আশরাফুল ইসলাম বক চত্বরের কাছে, সুরুজ আলী বাবু বার্মিজ গলিতে, মুস্তাকিন ও উসামা আড়ংয়ের সামনে, বাবলু ফরাজী তুলাপট্টির গলিতে এবং ইউসুফ শেখ ফায়ার সার্ভিসের উল্টোদিকে প্রাণ হারান। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে রাজপথে নামেন কুষ্টিয়ার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। তাদের মধ্যে আশরাফুল ইসলাম বক চত্বরের প্রায় ৫০ গজ উত্তরে, সুরুজ আলী বাবু বার্মিজ গলিতে, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও উসামা হরিপুরগামী সড়কে আড়ংয়ের সামনে, বাবলু ফরাজী তুলাপট্টির গলিতে এবং ইউসুফ শেখ ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত দিকে সড়কে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, প্ররোচনা এবং উসকানিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে চার আসামির সম্পৃক্ততার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রসিকিউশন পক্ষ দাবি করেছে, ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর মতো পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নেও আসামিদের সমর্থন ছিল, যার ফলে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।

