ঘরের মাঠে দীর্ঘদিনের অজেয় থাকার রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে বর্তমান দুইবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারত। শনিবার বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পাঁচ ম্যাচ সিরিজের পঞ্চম ও শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে আয়োজকরা মুখোমুখি হচ্ছে সাবেক দুইবারের টি-টোয়েন্টি ট্রফি জয়ী ওয়েস্ট ইন্ডিজের। তবে হাই-ভোল্টেজ এই শেষ ম্যাচের ওপর বৃষ্টির কালো ছায়া ঝুলছে, যা দুই দলের লড়াইকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
চলমান এই টি-টোয়েন্টি সিরিজটি ব্যাটারদের তাণ্ডব ও রানের মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। পুরো সিরিজজুড়ে বোলাররা চার-ছক্কার বন্যায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন, যার ফলে ২২০ রানের বেশি বড় সংগ্রহও নিরাপদ মনে হচ্ছে না। চার ম্যাচের তিনটিতেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ অসামান্য ব্যাটিংয়ের পরিচয় দিয়েছে; তারা একবার ২৫০ রানের বিশাল লক্ষ্য সফলভাবে তাড়া করেছে, অন্য ম্যাচে ২৪৭ রান তুলে ২৪ রানে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে এবং অপর ম্যাচে ২২৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে জয়ের একদম দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।
বোলিং লাইনআপের সংকট ও ভারতের ভবিষ্যৎ চিন্তা
এই রান উৎসবের সিরিজে দুই দলের বোলারদের কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, যার ফলে ভারতের বোলিং বিভাগের কার্যকারিতা গভীর পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে। জসপ্রীত বুমরাহ ও হার্দিক পান্ডিয়া পরবর্তী যুগে ভারতের টি-টোয়েন্টি বোলিংয়ের চেহারা কেমন হবে—সেই অনুত্তরিত প্রশ্নটি এই সিরিজে তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে। বুমরাহ, হার্দিক ও ওয়াশিংটন সুন্দরকে ছাড়া নামা প্রায় পূর্ণ শক্তির এই ভারতীয় ক্রিকেট দল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটারদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
শাই হোপের দুর্দান্ত ফর্ম ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইতিহাস গড়ার সুযোগ
সফরকারী ব্যাটার হিসেবে ভারতে অন্যতম সফল একটি সিরিজ কাটাচ্ছেন ক্যারিবীয় তারকা শাই হোপ। এই সফরেই তিনি ইতিমধ্যে চারটি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন—যার মধ্যে দুটি ওয়ানডেতে এবং দুটি টি-টোয়েন্টিতে। বলা চলে, প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই তিনি দুই দলের মধ্যে প্রধান ব্যবধান গড়ে দিয়েছেন। এই সীমিত ওভারের সফরে হোপ যতবার অপরাজিত থেকে মাঠ ছেড়েছেন, ততবারই ওয়েস্ট ইন্ডিজ জয় পেয়েছে। পাঁচ ম্যাচে তিনি মোট ৫৩৯ রান সংগ্রহ করেছেন। শনিবার বেঙ্গালুরুতে আরও একটি রান উৎসবের পিচ প্রস্তুত থাকায় হোপ নিজের ব্যাটিং ধার বজায় রাখতে মরিয়া থাকবেন। যদি ওয়েস্ট ইন্ডিজ এই শেষ ম্যাচে জয় হাসিল করতে পারে, তবে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ০-২ ব্যবধানে হারার পর তারা প্রথম দল হিসেবে ভারতের মাটিতে ভারতকে টি-টোয়েন্টি সিরিজে হারানোর কীর্তি গড়বে।
ভুবনেশ্বর কুমারের প্রত্যাবর্তন ও ব্যাকআপ ভূমিকা
সিরিজের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভারতীয় দলে অভিজ্ঞ পেসার ভুবনেশ্বর কুমারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত পূর্ববর্তী ম্যাচে ২৪৮ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে ব্যাটিংয়ের শেষ ওভারে বোলিং হাতে চোট পান আরশদীপ সিং। তার ইনজুরি কাভার বা বিকল্প হিসেবে ৩৬ বছর বয়সী ভুবনেশ্বরকে দলে নেওয়া হয়েছে। এর আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হতে যাওয়া পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের দলেও তাকে নির্বাচন করা হয়েছিল। ভুবনেশ্বর কুমার শেষবার ২০২২ সালের নভেম্বরে অ্যাডিলেড ওভালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ভারতের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন।
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) গত দুই মৌসুমে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের হয়ে দুরন্ত পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই অভিজ্ঞ এই সুইং বোলার জাতীয় দলে নিজের জায়গা পুনরুদ্ধার করেছেন। শেষ দুটি আইপিএল আসরে চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামকে নিজের ঘরের মাঠ বানিয়ে খেলা ভুবনেশ্বর মোট ৪৫টি উইকেট শিকার করেন এবং ফ্র্যাঞ্চাইজিটির ট্রফি জয়ের অভিযানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। নতুন বলে তার ধ ধারাবাহিকতা এবং বিপুল অভিজ্ঞতা তাকে ভারতীয় টি-টোয়েন্টি স্কোয়াডে আবারও সুযোগ এনে দিয়েছে।
ব্যাটিং বিভাগ ও ক্যারিবীয়দের পুনরুত্থানের স্বপ্ন
ভারতের ব্যাটিং অর্ডারে সঞ্জু স্যামসন দারুণ ছন্দে রয়েছেন এবং চলতি সিরিজে ইতিমধ্যে দুটি হাফ-সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন। ওপেনার অভিষেক শর্মা তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে বেশ সাবলীল দেখালেও চতুর্থ ম্যাচে কিছুটা ধুঁকেছেন, যেখানে তিনি ২৪ বল খেলে ২৯ রান করেন। অন্যদিকে, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে ক্রিকেটের ঐতিহ্য ফেরাতে সম্প্রতি বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের মাটিতে একটি সিরিজ জয় ক্যারিবীয়দের জন্য একটি অপ্রত্যাশিত ও বিশাল বোনাস হিসেবে গণ্য হবে। তবে শেষ পর্যন্ত যারা ব্যাটিংবান্ধব উইকেটে মানসিকভাবে শক্ত থাকবে, জয় তাদের ঝুলিতেই যাবে। কোনো সন্দেহ নেই যে ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টিতে অপরাজিত থাকার রেকর্ড রক্ষা করার প্রবল চাপ ভারতের ওপরই বেশি থাকবে।
বেঙ্গালুরুর আবহাওয়া ও চিন্নাস্বামীর ঐতিহাসিক পরিবেশ
বৃষ্টির কারণে ম্যাচটি ব্যাহত হওয়ার বড় ধরনের আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়া পূর্বাভাসের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বেঙ্গালুরুতে বৃষ্টিপাতের শতভাগ সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টির বাধা না থাকলে দর্শকদের জন্য ছক্কার বৃষ্টি দেখা নিশ্চিত ছিল। ম্যাচ অনুষ্ঠিত হলে সিরিজ জয় নিশ্চিত করতে ভারতীয় ব্যাটারদের ছক্কা হাঁকানোর লড়াইয়ে এগিয়ে থাকতে হবে। উল্লেখ্য, শুক্রবার বেঙ্গালুরুজুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি জায়গায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী এই বর্ষণ আরও কয়েকদিন চলতে পারে, যার ছোঁয়া শনিবারের ম্যাচ দিবসেও থাকবে।
- এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামটি ঐতিহ্যগতভাবেই ব্যাটারদের স্বর্গরাজ্য এবং বোলারদের জন্য অন্যতম কঠিন ভেন্যু হিসেবে বিবেচিত।
- ছোট বাউন্ডারি এবং ফ্ল্যাট পিচের কারণে ব্যাটাররা সাবলীলভাবে বড় বড় শট খেলতে পারেন এবং দ্রুত রান তুলতে সক্ষম হন।
- বোলারদের সামান্য ভুলেরও কোনো সুযোগ না থাকায় এখানে বড় সংগ্রহের ম্যাচ দেখা খুব সাধারণ ঘটনা।
- তবে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে প্রথম টেস্টের পর থেকে এই স্টেডিয়ামটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মূল লাইমলাইট থেকে কিছুটা দূরে রয়েছে।
- উক্ত টেস্টের পর থেকে এই ঐতিহাসিক মাঠে আর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি এবং বড় টুর্নামেন্টের সূচিও ছিল না।
- আইপিএলের কয়েকটি রোমাঞ্চকর ম্যাচ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে খুব বেশি হাই-প্রোফাইল ম্যাচ আয়োজন করা হয়নি।

