দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে পুনরায় গ্রাম সরকার ব্যবস্থা কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনপ্রশাসনকে আরও গতিশীল করতে এই বিশেষ ব্যবস্থাটি ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। আইসিসিবিতে জাপানি গাড়ির ৫০ বছরের ইতিহাস নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী। বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ: জার্মান এমপি আরমান্ড জর্নের উদ্বেগ। স্থানীয় পর্যায়ে চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক বিষয়ও পর্যালোচনা করবে গ্রাম সরকার। আইনটি পাশ হলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের উদ্যোগে আবারও গ্রাম সরকার ব্যবস্থা ফিরবে। যদি গ্রাম সরকার ব্যবস্থা আইন মেনে চলে তবে জনগণের দীর্ঘ দিনের রাজনীতি বিমুখতা দূর হবে।’। গ্রামীণ জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে তার সময়ে এ সরকার চালু করা হয়।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে গ্রাম সরকার পুনর্বহালের বিষয়টি নীতিগত অনুমোদন পায়। এর ভিত্তিতে ‘গ্রাম সরকার আইন ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। ২০০৩ সালের যে আইনটি ২০০৯ সালে বাতিল করা হয়েছিল, সেই আইনটিকে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন ও সময়োপযোগী করে নতুন এই খসড়া তৈরি করা হয়েছে। আইনটি ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৩ সালে প্রণীত হয়।
নতুন প্রস্তাবিত এই আইনে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে গ্রাম সরকার গঠনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন গ্রাম সরকার প্রধান, একজন উপদেষ্টা এবং ১৫ জন সদস্য থাকবেন। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য পদাধিকার বলে প্রধান এবং সংরক্ষিত আসনের সদস্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন খসড়ায় সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কয়েকটি নতুন দায়িত্ব যুক্ত করা হয়েছে। এ জন্য সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিতে হবে। তবে তার আগে গ্রাম সরকারকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে।
জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পাঁচ বছর মেয়াদি এই গ্রাম সরকারের সদস্যদের নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটারদের সরাসরি ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটের বিধান রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশের সাড়ে ৪ হাজারের বেশি ইউনিয়নের ৪১ হাজার ওয়ার্ডে প্রায় ৭ লাখ স্থানীয় প্রতিনিধি এই ব্যবস্থার অধীনে যুক্ত হবেন।
নতুন এই ব্যবস্থায় গ্রাম সরকার প্রধান ও তার দল প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার সভা করবেন এবং প্রতি ছয় মাসে অন্তত একবার সাধারণ সভা আহ্বান করবেন। এই সভায় সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটারদের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি নিশ্চিত করার শর্ত রাখা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, মাদক ও জুয়া বন্ধ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে এই কমিটি ভূমিকা রাখবে। এ ক্ষেত্রে মোট ভোটারের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে। জেলা প্রশাসক তদন্তের পর প্রয়োজন মনে করলে গ্রাম সরকার বাতিলও করতে পারবেন।
সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ভিজিএফ-ভিজিডি কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সামাজিক সেবার তথ্য সংগ্রহ ও বিতরণে এই কমিটি সহায়তা করবে। পাশাপাশি স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা এবং সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারের মতো ব্যক্তি পর্যায়ের কার্যক্রমেও তারা সহযোগিতা করবেন। প্রতিটি গ্রাম সরকারের জন্য আলাদা তহবিল থাকবে, যেখানে ইউনিয়ন পরিষদ ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থ জমা রাখা হবে। এই তহবিলের তদারকি করবেন উপজেলা পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা। সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড বিতরণ এবং তথ্য সংগ্রহে সহায়তা, ভিজিএফ ও ভিজিডি কার্যক্রমে সহযোগিতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সহায়তা এবং ব্যক্তি পর্যায়ে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারে।
বর্তমানে ‘গ্রাম সরকার আইন ২০২৬’-এর খসড়াটি স্থানীয় সরকার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত নাগরিকরা তাদের মতামত ও পরামর্শ ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠাতে পারবেন। জনসাধারণের মতামত গ্রহণের পর আইনটির খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদে উপস্থাপন করা হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগেরর ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত ই-মেইল ঠিকানায় মতামত পাঠাতে হবে। নাগরিকদের মতামত পাওয়ার পর আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে।
সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খসড়াটি চূড়ান্ত হলেও এটি পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপ নিতে এখনো কয়েকটি আইনি ধাপ বাকি রয়েছে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের সিদ্ধান্তের ওপর এর দ্রুত কার্যকারিতা নির্ভর করছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে গ্রাম সরকার ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। ১৯৮০ সালের আইনের মাধ্যমে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলেও ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে তা বিলুপ্ত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে স্থানীয় সরকার (গ্রাম পরিষদ) আইন এবং ২০০৩ সালে নতুন করে ‘গ্রাম সরকার আইন’ প্রণয়ন করা হয়েছিল, যা ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে রহিত করা হয়।

