জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হতে লানা নুসায়বেহকে সমর্থন দিতে পারে যুক্তরাজ্য

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কূটনীতিক লানা নুসায়বেহকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে যুক্তরাজ্য।

নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশটির সরকারের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র থেকে এমন তথ্য জানা গেছে।

তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি লন্ডন।

এদিকে, জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে প্রার্থীদের যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের প্রধান অগ্রাধিকার হলো এমন এক প্রার্থী খুঁজে বের করা, যিনি আমাদের বৈশ্বিক সংকটগুলো মোকাবিলায় জাতিসংঘকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।’। ওই মুখপাত্র বলেন, ‘জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নিতে আমরা প্রার্থীদের যোগ্যতার ওপর নজর দিচ্ছি।

তিনি জানান, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে বিচার করেই প্রার্থী নির্বাচন করা হবে এবং নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীর বিষয়ে এই মুহূর্তে প্রকাশ্যে মন্তব্য করা হবে না।

৪৮ বছর বয়সী লানা নুসায়বেহ জাতিসংঘে আমিরাতের প্রথম নারী স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সাধারণ পরিষদের সহসভাপতি, ‘ইউএন উইমেন’ নির্বাহী বোর্ডের সভাপতি এবং দুইবার নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব সামলেছেন। এর আগে তিনি ইউনেসকোর পরামর্শক এবং গলফ রিসার্চ সেন্টারের গবেষক ছিলেন। এছাড়া আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতি পরিকল্পনা বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। নির্বাচিত হলে তিনি হবেন জাতিসংঘের প্রথম নারী মহাসচিব এবং মিসরের বুট্রোস বুট্রোস-ঘালির পর দ্বিতীয় আরব মহাসচিব। ১৯৭৮ সালে জন্মগ্রহণকারী নুসায়বেহ ইউনেসকোর পরামর্শক ও গলফ রিসার্চ সেন্টারের গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৩ সালে নুসায়বেহ জাতিসংঘে আমিরাতের প্রথম নারী স্থায়ী প্রতিনিধি নিযুক্ত হন এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। আরও আগে পদক্ষেপ নেওয়া, মতপার্থক্য সত্ত্বেও মানুষকে এক ছাতার নিচে আনা এবং ফলপ্রসূ ফলাফল না আসা পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

নুসায়বেহর বংশপরিচয় ও রাজনৈতিক পটভূমি বেশ আলোচিত।

তিনি ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এবং জেরুজালেমের বাসিন্দা পরিবারের সন্তান। তাঁর দাদা আনোয়ার নুসায়বেহ জর্ডান সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে জর্ডানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। যুক্তরাজ্যে সোয়াস (এসওএএস) বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ইসরায়েল–বিষয়ক ইমেরিটাস অধ্যাপক কলিন শিন্ডলার তাঁর শিক্ষক ছিলেন। শিন্ডলারের ভাষ্যমতে, নুসায়বেহ ইসরায়েলি গবেষণায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন এবং জায়নবাদ ও ইসরায়েলের ইতিহাসের ওপর প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এছাড়া ‘আব্রাহাম চুক্তি’র ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে ধারণা করা হয়। শিন্ডলার বলছেন, ২০২০ সালে ‘জুয়িশ ক্রনিকল’-এর একটি কলামে লিখেছিলেন, নুসায়বেহ ইসরায়েলি গবেষণায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিলেন।

তবে নুসায়বেহর এই প্রার্থিতা নিয়ে কিছু বিতর্কও সামনে এসেছে। বিশেষ করে সুদানের গৃহযুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা চলছে। জাতিসংঘের তদন্তকারীদের দাবি, সেখানে আরএসএফ বা ‘র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’-এর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডে গণহত্যার সুস্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। এসব প্রতিবেদনে আরএসএফ-কে আমিরাত অস্ত্র ও সহায়তা দিচ্ছে বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যদিও আমিরাত সরকার ও নুসায়বেহ সবসময়ই এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে এসেছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল যখন অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরের কিছু অংশ সংযুক্ত করার কথা বিবেচনা করছিল, নুসায়বেহ তখন বলেছিলেন, আরব আমিরাত সব সময় এসব চুক্তিকে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেছে।

সুদানের পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাজ্য কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার আরএসএফ ও সুদানিজ আর্মড ফোর্সেস (এসএএফ)-এর ১৫ জন জ্যেষ্ঠ কমান্ডারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড জানিয়েছেন, দারফুরের আল ফাশারে ধর্ষণ ও অনাহারকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। মিলিব্যান্ড বলেন, ‘এগুলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, অপরাধীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

ইসরায়েলের সঙ্গে আরব আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেও নুসায়বেহর প্রার্থিতা সমালোচকদের নজরে পড়েছে। এর বাইরে ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাবকে কেন্দ্র করেও একটি বিতর্ক চলছে। ক্লাবটির মালিক আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল–নাহিয়ান। ক্লাবটির বিরুদ্ধে ১১ কোটি ডলারের বেশি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব আইনি পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় আমিরাত যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগ বাতিলের হুমকি দিতে পারে। এই টানাপোড়েনের মাঝে লানা নুসায়বেহকে সমর্থন দেওয়া আবুধাবির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি কৌশল হতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। বিগত মাসে এক তদন্তে উঠে এসেছে, ক্লাবটি ৮ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ডের (১১ কোটি ডলার) বেশি অবৈধ অর্থায়নের তথ্য গোপন করে প্রিমিয়ার লিগের ১১৪টি আর্থিক নিয়ম ভঙ্গ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ‘যৌন সহিংসতাসহ অন্যান্য নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত’ থাকার অভিযোগ রয়েছে।

জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে। এখন পর্যন্ত হওয়া ছয়টি অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটিতে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য কোনো প্রার্থীর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। নিরাপত্তা পরিষদ থেকে নাম প্রস্তাবের পর সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। লানা নুসায়বেহ গত সপ্তাহে তাঁর প্রচারে জানিয়েছেন, জরুরি ভিত্তিতে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় করতেই তিনি প্রার্থী হয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলো শেষ পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। গত সপ্তাহে মহাসচিবের দৌড়ে নুসায়বেহর যোগ দেওয়ার আগে ছয়টি অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটি হয়েছে। এসব ভোটাভুটির কোনোটিতেই জাতিসংঘের ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচ স্থায়ী সদস্য (যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স) যৌথভাবে কোনো প্রার্থীর বিষয়ে একমত হতে পারেনি। নিরাপত্তা পরিষদকে ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের জন্য একজন প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে হবে। গত সপ্তাহে তাঁর প্রচার শুরুর বিজ্ঞপ্তিতে নুসায়বেহ বলেন, ‘আমি মহাসচিব পদে প্রার্থী হয়েছি।