২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের সময় নির্বিচারে গুলি ও প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্ন রয়ে গেছে। আন্দোলন চলাকালীন হেলিকপ্টার থেকে গুলি, স্নাইপার রাইফেলের ব্যবহার, ৭.৬২ মিলিমিটারের বুলেটের প্রয়োগ এবং সিভিল পোশাকে অস্ত্রধারীদের উপস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হলেও, এসব ঘটনার পেছনে সুনির্দিষ্টভাবে কোন বাহিনীর কারা জড়িত ছিল, তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনো সামনে আসেনি।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোনো বিশদ তদন্ত না হওয়ায় জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। আন্দোলনকারীরা মনে করেন, ঘটনার শুরুতেই যদি এসব রহস্যের সুষ্ঠু তদন্ত হতো, তবে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসত।
উত্তরা আজমপুর এলাকায় আন্দোলনের সময় প্রাণঘাতী গুলিতে অনেকের মৃত্যু হয়। সেখানে সক্রিয় থাকা ওয়ালিদ ইসলাম নাঈম জমাদার বাংলাকে জানান, আন্দোলনের সময় হেলিকপ্টারের ব্যবহার এবং স্নাইপার থেকে গুলির বিষয়টি ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত এটা রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি যে গুলি হেলিকপ্টার থেকে হয়েছিল কি না, কোন কোন স্পটে স্নাইপার শ্যুট করা হয়েছে এবং কয়জন স্নাইপার শ্যুটে মারা গেছেন।”
নাঈম জমাদার আরও বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন শাখা রয়েছে—সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, বিজিবি বা ডিজিএফআই। কিন্তু ঠিক কোন বাহিনী বা কোন অংশটি তাদের ওপর গুলি চালিয়েছে, কিংবা অন্য কোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা এখনো ধোঁয়াশার মধ্যে রয়ে গেছে।
ঢাকার বাড্ডা লিংক রোড ও রামপুরা বনশ্রী এলাকায় সক্রিয় থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শেখ নাজমুস সাকিবও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি হেলিকপ্টার থেকে সিভিল পোশাকে অস্ত্রধারীদের উদ্ধার করে নিয়ে যেতে দেখেছেন। তার পাশে থাকা একজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি স্নাইপার রাইফেলের ব্যবহার হতে পারে বলে তিনি সন্দেহ করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রাণঘাতী গুলি, সন্দেহজনক স্নাইপার, হেলিকপ্টার এবং বহিরাগতদের অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তদন্ত করা হয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরুতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এম সাখাওয়াত হোসেন ৭.৬২ গুলির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি জানান, পুলিশের আহত সদস্যদের ক্ষত দেখে তিনি অবাক হয়েছিলেন। তার ভাষ্যমতে, “একটা ছেলেকে দেখলাম হাতে বুলেট, গুলি লেগে হাড্ডিতে গুড়োগুড়ো হয়ে গেছে। এগুলো আমি স্বচক্ষে দেখেছি। দেখার পর আমি বলেছিলাম যে এটা পুলিশকে কেন কীভাবে দেওয়া হলো?”
সাখাওয়াত হোসেন আরও দাবি করেন, সিভিল পোশাকে থাকা ব্যক্তিদের হাতে থাকা নিষিদ্ধ অস্ত্রগুলো কোথা থেকে এল, তা নিয়ে তিনি তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও কেবিনেটে কয়েকবার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তার সেই উদ্বেগকে কেউ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে কি না, তা তিনি জানেন না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, যদিও আলাদা কোনো তদন্ত হয়নি, তবে পুলিশের কাছে এই ধরনের গুলি বরাবরই ছিল। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এখন এসব তদন্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার চলছে। নতুন চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম বাংলাকে জানান, তাদের তদন্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ও ৭.৬২ গুলির ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে শুধু পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্রের পরিসংখ্যান তাদের কাছে রয়েছে, অন্য বাহিনীর কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, “পুলিশ যেসব লিথ্যাল উইপন ব্যবহার করেছে, তার মধ্যে এসএমজি, এলএমজি, চায়না রাইফেল, শটগান ও নাইন এমএম পিস্তল রয়েছে। সারা বাংলাদেশে পুলিশ প্রায় তিন লক্ষ পাঁচ হাজার গুলি ব্যবহার করেছে, যার মধ্যে ৯৫ হাজার গুলি শুধু ঢাকাতেই ব্যবহৃত হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রের পরিচয় বা পরিসংখ্যান সংগ্রহের কাজ এখনো চলমান। তাদের তদন্তে উত্তরায় মীর মুগ্ধসহ অনেকের মৃত্যুর পেছনে স্নাইপারের ব্যবহারের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো স্নাইপার রাইফেল জব্দ করা সম্ভব হয়নি, তবে বুলেটের গতিপথ ও আঘাতের ধরন দেখে এর ব্যবহার সম্পর্কে তারা নিশ্চিত হয়েছেন।
সাবেক উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন জানান, অগাস্ট মাসে তিনি অজ্ঞাত সূত্র থেকে স্নাইপার সম্পর্কে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। এছাড়া দুটি মৃতদেহের এক্স-রে দেখে তিনি নিশ্চিত হন যে, স্নাইপার ছাড়া এত সূক্ষ্ম নিশানা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “স্নাইপার কিন্তু ভাইটাল জায়গাগুলোতে ফায়ার করে।”
পুলিশ সদরদপ্তরের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের আগে পুলিশের কাছে কোনো স্নাইপার রাইফেল ছিল না। গণমাধ্যমে যে স্নাইপার কেনার দরপত্র এসেছে, সেগুলো জাতিসংঘ মিশনের জন্য কেনা হয়েছিল এবং ২০২৫ সালে পুলিশের হাতে এসেছে।
এদিকে, সিভিল পোশাকে স্নাইপার ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতারা অভিযোগ করছেন, স্নাইপার ব্যবহার করে লাশ ফেলে আন্দোলনকে উসকে দেওয়া হয়েছিল।
আন্দোলনকারী নাজমুস সাকিব মনে করেন, সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়ার কারণেই এমন ভিন্ন ভিন্ন ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তিনি বলেন, “তদন্ত না হওয়ার কারণেই এখন শোনা যাচ্ছে যে কোনো দল বা কোথা থেকে এসব করা হয়েছে, যাতে তৎকালীন সরকারের ওপর দায় চাপানো যায়।”
ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের মতে, এখন নির্বাচিত সরকারের উচিত এই ঘটনার আদ্যোপান্ত তদন্ত করা। তিনি বলেন, “এটা কারা ডিজাইন করেছে, এক্সেসিভ ফোর্স কেন ব্যবহার করা হলো, স্নাইপার কেন ব্যবহার করা হলো, কে হুকুম দিল—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, সরকার এখন স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। যদি এখন এসব ঘটনার তদন্ত না করা হয়, তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও, মন্ত্রণালয় সূত্রগুলো জানিয়েছে যে জুলাই হত্যা মামলার সঙ্গে এই তদন্তগুলোও যুক্ত থাকবে।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় থেকে তারা সব ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছেন এবং আলোচিত প্রতিটি ইস্যুর তদন্ত করা হবে।
জুলাই আন্দোলনের শহীদদের পরিবার এবং আহতরা এখন কেবল বিচারের অপেক্ষায় নেই, তারা জানতে চান সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে পর্দার আড়ালে কারা ছিল এবং কেন প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তদন্তের এই দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে। তবে ট্রাইব্যুনাল ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর দাবি, তারা এখন প্রতিটি অস্ত্রের উৎস ও ব্যবহারের কারণ খুঁজে বের করতে কাজ করছে।
স্নাইপার রাইফেলের ব্যবহার ও বহিরাগত অস্ত্রধারীদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
পরিশেষে, জুলাই আন্দোলনের প্রতিটি মৃত্যুর বিচার এবং ঘটনার পেছনের সত্য উন্মোচন করা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্ব।

