বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের ওপর নতুন করে শুল্ক কার্যকর করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মূলত জোরপূর্বক শ্রম রোধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এই নতুন শুল্ক কাঠামোর আওতায় কয়েকটি দেশের ওপর ১০ শতাংশ এবং বাকি দেশগুলোর ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ করা হয়েছে।
তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাজ্য, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান, ভারত ও পাকিস্তানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদাররা রয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে অস্থায়ীভাবে যে ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছিল, তার মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন অর্থাৎ শুক্রবার থেকেই এই নতুন শুল্ক কার্যকর করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিশ্ব বাণিজ্যে যে অস্থিরতা ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, এটি তারই সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে জানিয়েছিল যে, জরুরি ক্ষমতার আওতায় ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে যে শুল্ক আরোপ করেছিল, তার কোনো আইনি বৈধতা ছিল না।
আদালতের সেই রায়ের পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার প্রধান বাণিজ্য নীতি বাস্তবায়নের জন্য নতুন আইনি পথ খুঁজতে শুরু করেন।
গত মাসেই হোয়াইট হাউস ডজনখানেক দেশ থেকে মার্কিন উপকূলে পৌঁছানো পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কের একটি ধারাবাহিক প্রস্তাব দিয়েছিল।
এই শুল্ক আরোপের মূল কারণ হিসেবে মার্কিন কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো জোরপূর্বক শ্রম মোকাবিলায় পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশ অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে এই শুল্কগুলো এখন থেকে কার্যকর হবে।
এক বিবৃতিতে জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, আজকের এই পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বাণিজ্য বিকৃতির মতো বিষয়গুলোর সংশোধন শুরু করবে, যা সব সময় শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
তিনি ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১ প্রয়োগ করেছেন, যা মূলত মার্কিন বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত বা ক্ষুণ্ণ করে এমন অনুশীলনের বিরুদ্ধে মার্কিন বাণিজ্য ব্যবস্থাপনাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
এর আগে চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে ১৯৩০ সালের শুল্ক আইনের সেকশন ৩৩৮ বিধানের আশ্রয় নিয়েছিল।
বৃহস্পতিবার মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় জানায় যে, বাণিজ্য অংশীদাররা জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই এই নতুন শুল্কগুলো আরোপ করা হচ্ছে।
কার্যালয়টির তথ্য অনুযায়ী, নতুন এই শুল্কগুলো যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৬০টি বাণিজ্য অংশীদারের ওপর প্রযোজ্য হবে, যা মার্কিন আমদানির প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পূরণ করে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি আরও জানিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে অন্যান্য দেশের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে তৈরি পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞাকে বাধ্যতামূলক করেছেন।
যেসব বাণিজ্য অংশীদার দেশ জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে তৈরি পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে অঙ্গীকার করেছে এবং কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়ন করেছে, তাদের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
অন্যদিকে, যারা এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ উচ্চ হারের শুল্ক প্রযোজ্য হবে বলে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় জানিয়েছে।
১০ শতাংশ শুল্কের আওতায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, কানাডা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং যুক্তরাজ্য।
শুল্কের হার ১০ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, দেশগুলোকে অবশ্যই জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করতে হবে অথবা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে এমন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তাইওয়ান, জাপান, কোরিয়া এবং সুইজারল্যান্ডের নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে সেকশন ৩০১ শুল্কের হার হবে সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের (এমএফএন) হারের অতিরিক্ত ১০ শতাংশ অথবা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
গ্রিয়ার তার বিবৃতিতে জানিয়েছেন, যেসব বাণিজ্য অংশীদার জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে তৈরি পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত দ্রুত গ্রহণ করেছে, তাদের দেখে তিনি উৎসাহিত বোধ করছেন এবং তাদের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবেন।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, শুল্ক মার্কিন শ্রমিকদের সুরক্ষা দেয়, উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান বাড়ায় এবং মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে।
গত বছর হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর, বৈশ্বিক বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছিলেন, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের অন্যায় আচরণের শিকার হওয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছিল এবং জানিয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। ওই সময় কোম্পানিগুলোকে শুল্ক বাবদ পরিশোধ করা কয়েক হাজার কোটি ডলার ফেরতও দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে, ব্রাজিল ও কানাডার মতো দেশগুলোর ওপরও বিভিন্ন ধরনের একগুচ্ছ শুল্ক আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। পাশাপাশি বর্তমানে স্থগিত থাকলেও পাল্টাপাল্টি শুল্ক যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন যে, উচ্চ শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কফি এবং মাইক্রোওয়েভের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
যেহেতু আমদানিকারক কোম্পানিগুলোকেই কর পরিশোধ করতে হয়, তাই সেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই উচ্চমূল্যের মাধ্যমে ক্রেতাদের ওপর অতিরিক্ত খরচের বোঝা চাপিয়ে দেয়।
শ্রম বিধিমালার মতো বাণিজ্যবহির্ভূত বিষয়ের মাধ্যমে মেক্সিকোর মতো অন্যান্য দেশের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে এই শুল্কগুলো ব্যবহার করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
এর জবাবে অনেক বাণিজ্য অংশীদার দেশ ইতিমধ্যে সম্ভাব্য আইনি লড়াই অথবা পাল্টা শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি বর্তমানে ১৬টি দেশের ওপর তদন্ত পরিচালনা করছেন, যা মার্কিন আমদানির সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে। এই দেশগুলোর বিরুদ্ধে উৎপাদন সক্ষমতা অতিরিক্ত বাড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে, যা চলতি বছরের শেষের দিকে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
ব্রাজিলের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপকে অন্যায্য এবং খামখেয়ালিপূর্ণ বলে অভিহিত করেছে। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে নিজেদের সুরক্ষাবাদী বাণিজ্য নীতির সমর্থনে ব্যবহার করছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়া ব্রাজিল জানিয়েছে, তারা তাদের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে এবং পণ্য বিক্রির জন্য অন্যান্য বাজারও বিবেচনা করবে।
জাপান সরকার শুক্রবার জানিয়েছে, নতুন মার্কিন শুল্ক আরোপের ঘটনায় তারা দুঃখ প্রকাশ করছে। তাদের বক্তব্য, জাপানের বাণিজ্য আন্তর্জাতিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পরিচালিত হয়।
অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ডন ফ্যারেল বলেছেন, এই শুল্ক আরোপ সম্পূর্ণভাবে অন্যায্য। তার দেশের পণ্যের ওপর আরোপিত সব শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য তিনি ওয়াশিংটনের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবেন বলে জানিয়েছেন।
চীন এর আগেও বলেছে যে তারা যেকোনো ধরনের একতরফা শুল্ক আরোপের বিরোধী। একই সঙ্গে দেশটি জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগও অস্বীকার করেছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেছেন, চীনে তথাকথিত কোনো জোরপূর্বক শ্রম নেই এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রভাব খাটানোর অজুহাত হিসেবে এ বিষয়টি ব্যবহার করার আমরা বিরোধিতা করি।
তবে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন বলেছে, চীনে জোরপূর্বক শ্রমের অস্তিত্ব রয়েছে, বিশেষ করে শিনজিয়াং অঞ্চলের মুসলিম জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে।

