জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সংকটে শিল্প খাত, উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ঘোষণায় দেশের শিল্পখাতে নতুন করে উদ্বেগের ছায়া পড়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকায় নির্ধারণ করায় পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন উদ্যোক্তারা। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে প্লাস্টিক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, রড, সিমেন্টসহ প্রায় প্রতিটি খাতেই দাম বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল পলিমারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে কাঁচামাল পেট্রোকেমিক্যালের দাম ইতিমধ্যেই ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ বেড়েছে। এর ওপর পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি এবং লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটরের জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা পণ্যের দাম ৪-৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্যের বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ২০ শতাংশ কম। দাম বাড়ালে তা আরও ৭-৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় শুধু উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে না, সেই সঙ্গে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের মার্জিন সমন্বয় করতে গিয়ে বাজারে পণ্যের দাম আরও বৃদ্ধি পাবে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, জ্বালানির বাড়তি খরচের কারণে ব্যবসায়িক ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি জানান, ছোট আকারের মোড়কজাত পণ্যের দাম আগের মতো রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, ফলে দাম বাড়ানোই একমাত্র উপায়।

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী এসিআই গ্রুপের প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা কামরুল হাসান জানিয়েছেন, আটা, ময়দা ও মসলার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন খরচ কতটা বাড়ছে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নির্মাণ খাতেও এর বড় প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সুমন চৌধুরী জানান, জ্বালানি খরচের প্রভাবে রড উৎপাদনের ব্যয় টনপ্রতি ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। একইসাথে সিমেন্ট ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়লে নির্মাণ খাতে স্থবিরতা দেখা দেওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

তৈরি পোশাক শিল্পের পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠছে বলে জানালেন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পোশাক পরিবহনে কাভার্ড ভ্যান প্রতি খরচ ১৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর পরিচালনায় বাড়তি ব্যয় ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় মজুরি বৃদ্ধির দাবির বিষয়টিও পোশাক শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে আসতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

উল্লেখ্য, গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম ১৫ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা, অকটেন ২০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। পরবর্তীতে জুন মাসে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বৃদ্ধি পায়। সর্বশেষ এই দফায় পেট্রলের নতুন দাম লিটারে ১৬০ টাকা ও অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের তদারকির ওপর জোর দিয়েছেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় পণ্যমূল্য বৃদ্ধি কিছুটা যৌক্তিক হলেও সরকার যেন নিয়মিত বাজার তদারকি করে। এছাড়া বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে দেশের বাজারেও যথাযথভাবে তা সমন্বয় করার পরিকল্পনা রাখা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিভিন্ন শিল্পের ১০ জন উদ্যোক্তা এমন ইঙ্গিত দিয়ে জানালেন, জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে খরচ বাড়বে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে এবার জ্বালানি তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে ৫, ১০ টাকার মতো কম দামের ছোট আকারের মোড়কজাত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না—এমন ইঙ্গিত দিলেন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্লাস্টিকের পাইপ ও ফিটিংস, দরজা, আসবাব ইত্যাদি পণ্য উৎপাদন করে ন্যাশনাল পলিমার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মোড়কজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি অথবা পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে ব্যয় সামাল দেয় উৎপাদক প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আবার খুচরা দোকানদার ও ডিলারদের মার্জিনও বাড়াতে হবে।