বাংলাদেশের রাজধানীতে চলাচলের সময় মন্ত্রীরা এতদিন যে ‘পুলিশ প্রটোকল’ বা বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধা পেয়ে আসছিলেন, বেশিরভাগের কাছ থেকে সম্প্রতি সেটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে সরকার। ফলে গত সপ্তাহখানেক ধরে তাদেরকে পুলিশের বিশেষ প্রহরা ছাড়াই ঢাকার রাস্তায় চলাচল করতে হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বহর থেকে পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা কমিয়ে এনেছেন।
বর্তমানে মন্ত্রিসভার দুই ডজন পূর্ণমন্ত্রীর মধ্যে কেবল ছয়জন জ্যেষ্ঠ সদস্য ঢাকার ভেতরে পুলিশের বিশেষ প্রটোকল পাচ্ছেন। বাকি ১৮ জন মন্ত্রী এখন থেকে কেবল ঢাকার বাইরে সরকারি সফরে যাওয়ার সময় এই নিরাপত্তা সুবিধাটি নিতে পারবেন।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এর ফলে বাহিনীর সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আগের চেয়ে বেশি সময় ও মনোযোগ দিতে সক্ষম হবেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, প্রটোকলের গাড়িগুলো থানায় ফেরত যাওয়ায় বাহিনীর যানবাহন সংকটও অনেকাংশে কমে আসবে।
তারেক রহমানের সরকার হঠাৎ কেন মন্ত্রীদের এই পুলিশ প্রটোকল তুলে নিল, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বাংলাকে বলেন, এটি হুট করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
তিনি জানান, নির্বাচনের আগেই তারেক রহমান পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন যে, ক্ষমতায় গেলে প্রশাসনে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে জনগণের অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হবে। নতুন এই সিদ্ধান্ত সেই পরিকল্পনারই একটি অংশ।
গত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর পাঁচদিনের মাথায় বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় ২৪ জন পূর্ণমন্ত্রী ছাড়াও জায়গা পান ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী।
এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর ১০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজনকে মন্ত্রীর এবং বাকি পাঁচজনকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বিএনপি সরকারে থাকা এই ৫৮ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মধ্যে ২৪ জন মন্ত্রী এবং মন্ত্রী পদমর্যাদার কয়েকজন উপদেষ্টা গত পাঁচ মাস ধরে পুলিশ প্রটোকল পেয়ে আসছিলেন।
তবে গত ২০শে জুলাই থেকে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাইরে মাত্র ছয়জন মন্ত্রী এখনও ঢাকার রাস্তায় বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধা পাচ্ছেন।
এই ছয়জন মন্ত্রী হলেন— স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের মধ্যে কেবল পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বর্তমানে পুলিশ প্রটোকল পাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, পদাধিকার বলে জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেতা, বিরোধী দলীয় উপনেতা, চিফ হুইপ এবং বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ আগের মতোই পুলিশ প্রটোকল পেয়ে থাকবেন।
মন্ত্রিসভার যে ১৮ জন মন্ত্রীর পুলিশ এসকর্ট প্রত্যাহার করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের।
তালিকায় আরও রয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
এছাড়া পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আজম খান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, কৃষি ও মৎস্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এবং তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের প্রটোকলও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রটেকশন বিভাগের উপকমিশনার মো. শাহরিয়ার আলম বাংলাকে বলেন, সরকারি নির্দেশনায় গত ২০শে জুলাই থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
সাধারণত একজন মন্ত্রীর প্রটোকল টিমে একজন উপপরিদর্শক (এসআই) এবং চারজন কনস্টেবলসহ মোট পাঁচজন পুলিশ সদস্য থাকেন। তাদের বেতন-ভাতা, খাবার এবং গাড়ির জ্বালানি খরচ জনগণের করের টাকায় মেটানো হয়।
পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রীদের বাড়তি নিরাপত্তা দিতে গিয়ে অনেক পুলিশ সদস্যকে নিয়মিত থানার বাইরে রাখতে হতো, যা মামলার তদন্তসহ অন্যান্য কাজে ধীরগতি তৈরি করত।
বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা জানান, ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে এমন নয় যে সব মন্ত্রীকে আলাদা সুরক্ষা দিতে হবে। বরং পুলিশকে থানায় রাখা গেলে সাধারণ মানুষ বেশি উপকৃত হবে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে মন্ত্রীরা সবাই প্রটোকল প্রত্যাহারের বিষয়ে একমত হয়েছেন বলেও তিনি জানান। তবে গুরুত্ব বিবেচনায় কিছু ক্ষেত্রে প্রটোকল রাখা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও তার পুলিশি প্রটোকল কমিয়ে এনেছেন। এখন তার মূল নিরাপত্তায় থাকছে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ), আর পুলিশের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে ১৮ জন মন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রায় ৯০ জন পুলিশ সদস্য এখন অন্য জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে যোগ দিতে পারছেন। এছাড়া প্রটোকলে গাড়ির ব্যবহার ২৫টি থেকে কমে সাতটিতে নেমেছে, যা জ্বালানি সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখছে।
সরকার এই সিদ্ধান্তকে স্থায়ী হিসেবেই দেখছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার ভাষ্যমতে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীতেও এই ধারা বজায় থাকবে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও সম্পদের অপচয় রোধ করা হবে।

