দখল, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনি পর্যায়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছেন যে, অপরাধের সাথে জড়িত যেই হোক না কেন, তাকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। এই নির্দেশের ধারাবাহিকতায় মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনা পাওয়ার পর মিষ্টি গত বুধবার জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সংবিধান অনুযায়ী পদত্যাগপত্র পাওয়ার সাথে সাথেই ফেরদৌসী আহমেদের সংসদ সদস্যপদ কার্যকরভাবে শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী আগামী ৯০ দিনের মধ্যে আসনটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওদিকে বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে যারা দখল, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত তাদের তালিকা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এসব সংগঠনের মোট ১১ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রায় দুই থেকে আড়াইশ দুষ্কৃতকারী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। এতে স্থানীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি অনেকের নাম উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি তদন্তে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহ্দী আমিন জানিয়েছেন, সরকার কোনো অপকর্ম মেনে নেবে না এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। রাড্ডায় দখলচেষ্টা, ইসিবি এলাকায় আবাসন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনার সমালোচনার মধ্যেই বুধবার ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। কমিটি বিলুপ্ত এবং বহিষ্কারের ঘটনা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের জবাবদিহি এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে আসছে। এর মধ্যে এমপি মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা সরকারের মূল অগ্রাধিকার। যদি কোনো দুষ্কৃতকারী অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাহলে কঠোর হাতে দমন করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলছে। তদন্তে অপরাধের প্রমাণ মিললে তার বিরুদ্ধে আইনগতভাবে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, অপরাধী যেই হোক, সরকার কোনো রাজনৈতিক শিথিলতা প্রদর্শন করবে না। এদিকে মিষ্টির পদত্যাগ ও দলের তিন কমিটি বিলুপ্তির ঘটনায় বিএনপির রাজনীতির ভেতরে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের সক্রিয় নেতাদের মূল্যায়ন এবং নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়ে এখন দলের অভ্যন্তরে বিভিন্ন আলোচনা চলছে। মহানগর উত্তর বিএনপির এই বড় পরিবর্তনের ফলে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। ইতিমধ্যে নতুন কমিটিতে জায়গা পেতে সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।
উল্লেখ্য যে, বিএনপি’র মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ছিলেন সদ্যপ্রয়াত সাবেক ছাত্রদল সভাপতি নাসির উদ্দিন পিন্টুর বড় বোন। তিনি মিরপুর এলাকার সাবেক কাউন্সিলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়া তার স্বামী প্রয়াত সাইদুর রহমান নিউটনও মিরপুরে ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন, যিনি এক সময় গুলিতে নিহত হন। গত ৩০ এপ্রিল সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশিত হয় এবং ৩ মে তারা শপথ গ্রহণ করেন। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের মোট সংখ্যা ৫০, যার মধ্যে বিএনপি’র মনোনয়নপ্রাপ্ত সদস্য রয়েছেন ৩৬ জন। অপরাধের বিরুদ্ধে বিএনপির এই সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণকে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে মাঠের নেতাকর্মীদের জবাবদিহিতার বিষয়টি সামনে এসেছে।

