‘পয়সার বিনিময়ে সারের লাইসেন্স দেবেন, তা হবে না’: এমপি

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে সার ডিলার নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) লুৎফুল্লাহেল মাজেদ। উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকায় প্রথম স্থানে থাকা আবেদনকারীকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকা আবেদনকারীকে নিয়োগ দেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছেন তিনি। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি তাঁকে উৎকোচ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও দাবি করেছেন এই সংসদ সদস্য। আজ শুক্রবার বেলা একটার দিকে ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে এসব অভিযোগ তোলেন তিনি। লুৎফুল্লাহেল মাজেদ লেখেন, ‘সরিষা ইউনিয়নে এ রকম লাইসেন্স যখন আমাদের ত্যাগী লোকদের বাইরে যায়, আর ফ্যাসিস্টের লোক—এই প্রকৃতির টাকা নিয়ে ঘোরা লোভী মানুষ যখন সবাইকে ডিঙিয়ে লাইসেন্স পায়, তখন উপজেলা ও জেলার সততা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।’

প্রশাসনের ওপর ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর আহ্বান

এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, ‘আমি সব জানি, এদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চাইনি। কে কোথা থেকে কত পার্সেন্ট টাকা নেয়, তা আমি জানি। আমাদের লোকেরা মামলা-হামলা খাবে আর আপনারা পয়সার বিনিময়ে সারের লাইসেন্স দেবেন, তা হবে না। কিসের রাজনৈতিক নেতাদের শুদ্ধি করবেন, সবার আগে প্রশাসনের লোকদের ওপর অপারেশন ক্লিনহার্ট চালানো দরকার।’ ফেসবুক পোস্টে তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরিষা ইউনিয়নে তালিকায় থাকা দুই নম্বর ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো স্বার্থ রয়েছে। তাঁর দাবি, উপজেলা থেকে তালিকা আসলেও জেলা প্রশাসক এটি পরিবর্তন করেছেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কলকাঠি নেড়েছেন। লুৎফুল্লাহেল মাজেদের দাবি, সরিষা ইউনিয়নের জন্য উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকায় প্রথম স্থানে ছিল জিওস্ট্রাক্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের নাম এবং দ্বিতীয় স্থানে ছিল জিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক জিয়াউর রহমান ভূঁইয়ার নাম। চূড়ান্ত তালিকায় দুই নম্বর ব্যক্তিকেই ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ১২ জন ডিলার নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। তা না হলে কেন এমন করা হবে?…উপজেলা থেকে তালিকা আসলেও ডিসি এটা চেঞ্জ করেছেন, এমনকি ইউএনও তলেতলে কলকাঠি নেড়েছেন।’।

প্রশাসনের অবস্থান ও নিয়োগপ্রাপ্তের বক্তব্য

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ আগস্ট জেলার ১৪টি উপজেলার ১৪৫টি ইউনিয়নে ১৫৬ জন সার ডিলার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে শুক্রবার সকালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমি আবেদন করার পর মুঠোফোনে কথা বলে সংসদ সদস্যের সহযোগিতা চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি কাউকে একটি টাকাও ঘুষ দিইনি। জেলা প্রশাসনের কারও সঙ্গেও যোগাযোগ করিনি।’ জেলায় এ নিয়োগের জন্য প্রায় ১ হাজার ৭০০টি আবেদন জমা পড়ে।

  • ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান জানান, ‘যিনি বাদ গেছেন, নিশ্চয়ই তাঁর কোনো ঘাটতি ছিল। নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালার বাইরে কোনো কিছু করা হয়নি।’
  • ঈশ্বরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান বলেন, ‘জেলা প্রশাসককে মুঠোফোনে জানিয়েছিলাম, দ্বিতীয়জন অভিযোগ দিয়েছেন যে প্রথমজনের আয়কর রিটার্ন নেই। আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক ছিল, বিষয়টি সংসদ সদস্যকেও জানানো হয়েছিল।’

সারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদিত তালিকায় ঈশ্বরগঞ্জের সরিষা ইউনিয়নে জিয়া এন্টারপ্রাইজকে ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জেলা কমিটির সুপারিশে প্রতিষ্ঠানটির নাম তালিকায় ছিল এক নম্বরে। তবে সংসদ সদস্যের দাবি, তালিকার সিরিয়াল ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ছিল। বর্তমানে এই নিয়োগ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত জিয়াউর রহমান নিজেকে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য বলে দাবি করলেও এমপি লুৎফুল্লাহেল মাজেদ তাকে প্রভাব বিস্তারকারী বলে অভিহিত করেছেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি নিয়মতান্ত্রিকভাবেই সম্পন্ন করা হয়েছে এবং সংক্ষুব্ধ আবেদনকারীদের অভিযোগ খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে। তবে সংসদ সদস্যের এই কঠোর বার্তা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। এই বিতর্কের জেরে ঈশ্বরগঞ্জে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপে কোনো পরিবর্তন আসে কি না, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে স্থানীয়দের।