বাংলাদেশের ৫ অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের পাঁচটি অগ্রাধিকারমূলক খাতে বিনিয়োগের জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানিয়েছেন। বুধবার (২৮ অক্টোবর) টোকিওতে স্থানীয় সময় বিকালে জেট্রো হলে আয়োজিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে তিনি এই আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে তিনি পারস্পরিক স্বার্থ ও ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে যৌথ সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ভোক্তা অর্থনীতির একটি হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মহাকাশবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ আগ্রহী। সুমিতোমো করপোরেশন জাপানি মানদণ্ড অনুসরণ করে এ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে তুলছে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাত চিহ্নিত করেন, যেখানে জাপানি বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এই খাতগুলো হলো মোটরযান উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা, আধুনিক রেলপথ ও সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। তারেক রহমান আশা প্রকাশ করেন যে, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে এবার একটি শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপান্তর করার সময় এসেছে। জাপানি কোম্পানিগুলো দেশে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান করতে পারে।

বিনিয়োগ ফোরামের প্রধান অংশীদার ও আলোচকবৃন্দ

  • জেট্রো প্রেসিডেন্ট: সুসুমু কাতাওকা অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করেন।
  • জাপানি মন্ত্রী: অতিথি বক্তা হিসেবে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী শিনজি ওয়াকায়ামা উপস্থিত ছিলেন।
  • অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বক্তব্য রাখেন।
  • বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান: ইনভেস্ট বাংলাদেশ-এর চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বাংলাদেশে বিনিয়োগ সহজীকরণের বর্তমান সংস্কার ও উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন।
  • সহযোগিতা: অনুষ্ঠানে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বিনিময় ও বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি সক্রিয় থাকলেও জাপানি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ এখনও ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের নিচে। সর্বশেষ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১৩৬ কোটি ডলার এবং বিপরীতে জাপান থেকে আমদানি ছিল ২১৬ কোটি ডলার। প্রধানমন্ত্রী জানান, উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আমি আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা নিয়ে কথা বলতে চাই। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি পুরোপুরি বুঝতে পারি, ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

তিনি স্মরণ করেন যে, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম সারির দেশগুলোর একটি ছিল জাপান।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার জাপান সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর করতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের উদ্বেগের কথা শুনেছি।

চলতি বছর স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দুই দেশের বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে, ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাবে।

বিনিয়োগের প্রসারে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের তরুণ শ্রমশক্তি এবং ১৮ কোটির বিশাল বাজারের কথা উল্লেখ করেন। বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের বাজার, ২৭ বছরের মধ্যম বয়সের উদ্যমী তরুণ শ্রমশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাংলাদেশের বড় সম্পদ।

তিনি জানান, ২০২৯ সালের মধ্যে টয়োটার কারখানা স্থাপনের কাজ পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে এবং সরকার এতে সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করবে। ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান এবং আরও ভালো ফল নিশ্চিত করতে কাজ করছি।’।

এছাড়া জ্বালানি খাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক তৈরির প্রস্তাব দিয়ে তিনি এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং মহাকাশ বিজ্ঞানে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এতে জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকেন্দ্রিক একটি উদ্ভাবনমুখী তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রেলপথ ও অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের কারিগরি সহযোগিতাকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রধান শহরগুলোকে ঘিরে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া আড়াইহাজারে অবস্থিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য তিনি জাপানি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করেছেন। সরকার বিনিয়োগকারীদের ব্যবসায়িক আস্থার পরিবেশ নিশ্চিতে দায়বদ্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে টয়োটাকে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর মাধ্যমে দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করে দুই দেশের কর্মসংস্থানের চাহিদা মেটানো সম্ভব। তিনি জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি গড়তে জাপান পাশে ছিল, এখন আসুন নতুন শিল্পকারখানা ও সম্ভাবনা তৈরির মাধ্যমে একসঙ্গে এগিয়ে যাই। এ উদ্যোগের জন্য জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণ, রুটের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি ও বিনিয়োগ স।