প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য আর পাহাড়ি বনাঞ্চলে ঘেরা পার্বত্য জেলা বান্দরবানে পর্যটন, কৃষি ও অবকাঠামো খাতের প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও নির্মাণসামগ্রীর সংকটে থমকে আছে এলাকার সামগ্রিক বিকাশ। জেলাজুড়ে প্রয়োজনীয় ইট উৎপাদনের কোনো বৈধ অনুমোদন না থাকায় ব্যক্তিগত ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো তৈরিতে চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। একদিকে দূরদূরান্ত থেকে কাঁচামাল আনার বাড়তি পরিবহন খরচ, অন্যদিকে কৃত্রিম বাজারসংকটে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে সাধারণ বাসিন্দাদের। একইসঙ্গে স্থানীয়দের জন্য জীবিকার বিকল্প সুযোগ না থাকায় দিনে দিনে বেকারত্ব ও নানামুখী সামাজিক সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো কাজ আমরা চাই না।”।
প্রতিবেশী জেলায় কাঁচামাল পাচার ও পরিবেশ সুরক্ষার বৈষম্য
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ অনুযায়ী, বান্দরবান সদর উপজেলার সোয়ালক ও মাঝেরপাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকার পাহাড়ি মাটি ও বনের কাঠ গোপনে সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও কেরানীহাটের বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে বান্দরবানের প্রাকৃতিক পরিবেশ যে ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে, স্থানীয়ভাবে ভাটা না থাকার পরেও সেই একই ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে জেলাবাসীকে। অথচ ওইসব বাইরের জেলায় প্রস্তুত করা ইট আবার চড়া দামে কিনে বান্দরবানে নিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতারা। এতে স্থানীয়ভাবে পরিবেশ রক্ষার যে যুক্তি তুলে ধরে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, তার প্রকৃত প্রয়োগ ও সুফল নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উপজেলাজুড়ে নির্মাণ ব্যাহত ও জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয়
বান্দরবান সদর, রুমা, থানচি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামা উপজেলার প্রতিটি এলাকাতেই বিদ্যালয়, উপাসনালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সংযোগ সড়ক এবং বসতবাড়ি নির্মাণের কাজ অব্যাহত রয়েছে।
কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবেশী চট্টগ্রামসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে অতিরিক্ত ভাড়ায় ইট পরিবহন করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিনির্ভর স্থানীয় ইট উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে নির্মাণ খরচ কমানোর পাশাপাশি জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এতে সীমিত ও মধ্যম আয়ের মানুষের পক্ষে স্থায়ী বাড়ি নির্মাণ বা সংস্কার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভৌগোলিক দূরত্ব ও দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা চড়া মূল্য হাঁকায় সাধারণ ক্রেতাদের নাভিশ্বাস উঠছে।
নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মেনে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব উপায়ে নিয়ন্ত্রিত উৎপাদন চালু করা গেলে এই খরচের লাগাম টানা সম্ভব হতো। জেলার কোন এলাকায় পরিবেশগত ঝুঁকি কম, কোথায় শিল্প স্থাপন করা সম্ভব এবং কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এসব বিষয় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট ও শ্রমজীবীদের অনিশ্চয়তা
একটি ইটভাটা কেন্দ্র করে কেবল ইট উৎপাদনই হয় না, বরং তার সঙ্গে যুক্ত থাকে মাটি সংগ্রহকারী, পরিবহন শ্রমিক, ট্রাকচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রুটি-রুজির সংস্থান। বান্দরবানে স্থানীয়ভাবে ইটভাটায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় এ ধরনের শ্রমভিত্তিক কাজের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মহীন হয়ে পড়া অনেক শ্রমিক জীবিকার তাগিদে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছেন বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে। নিয়ন্ত্রিত পন্থায় পরিবেশ সুরক্ষিত রেখে শিল্প স্থাপনের সুযোগ দিলে পাহাড়ি অঞ্চলের বিশাল বেকার জনগোষ্ঠীর সামনে নতুন উপার্জনের পথ তৈরি হতে পারে। একসময় যারা এ ধরনের কাজে যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকেই বেকার সময় পার করছে না হয় অনৈতিক কাজের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বিশেষ করে জেলায় ইটভাটা স্থাপনের অনুমতি না থাকায় উন্নয়ন ও নির্মাণকাজে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক, মাটি সরবরাহকারী, গাড়িচালক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয় এই খাতকে ঘিরে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় অংশীজনদের বক্তব্য
- লামা উপজেলার বাসিন্দা মনিরুল ইসলামনিজের থাকার ঘর বানাতে গিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে বাড়তি ভাড়ায় ইট আনতে হয়েছে। ইটের মূল দামের সঙ্গে পরিবহন ও বাড়তি শ্রমিকের মজুরি যোগ হয়ে নির্মাণ খরচ দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যায়। জেলাতেই যদি সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ইট প্রস্তুত করা যেত, তবে সাধারণ মানুষ চরম আর্থিক চাপ থেকে রেহাই পেত।
- স্থানীয় শ্রমিক বজলুল রশিদকর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় এলাকার বহু মানুষকে কাজের খোঁজে অন্য জেলায় যেতে হচ্ছে। ভাটা চালু থাকলে চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের নিয়মিত আয়ের পথ হতো, তবে অবশ্যই পাহাড়ি পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
- রুমা উপজেলার মংক্যাচিং মারমার বক্তব্যপার্বত্য এলাকার দুর্গম পথে দূর থেকে ইট পরিবহন করে আনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। পাহাড়ি পরিবেশ ঠিক রেখে স্থানীয়ভাবে উপাদান জোগানের ব্যবস্থা করলে দুর্গম এলাকার মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই লাঘব হবে।
- স্থানীয় ব্যবসায়ী নোমানদিনে দিনে জেলাজুড়ে অবকাঠামোগত কাজের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু বাইরে থেকে ইট সরবরাহ করতে গিয়ে সময়মতো মালপত্র পাওয়া যায় না এবং দামের ওপরও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। নিজস্ব উৎপাদন সুবিধা থাকলে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হতো।
টেকসই সমাধান ও পরিবেশ-উন্নয়নের সমন্বিত ভারসাম্য
বান্দরবানের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে পাহাড় ও বনাঞ্চল রক্ষার পাশাপাশ স্থানী নীতিমালার নমনীয়তা এবং জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে জরিপ চালিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার জোর দাবি উঠে এসেছে। বান্দরবান সদর, রুমা, থানচি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামার অবকাঠামো খাত সচল রাখতে দূষণমুক্ত আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে নির্মাণসামগ্রী তৈরির উপায় খতিয়ে দেখা এখন সময়ের দাবি। পাহাড় বাঁচিয়ে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে কীভাবে উন্নয়নের ভারসাম্য রক্ষা করা যায়, সেদিকেই নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জেলাবাসী।

