ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটকে সামনে রেখে প্রচারণায় গতি বাড়িয়েছেন ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার বিরুদ্ধে ২৫ অক্টোবরের লড়াইয়ে নামার আগে তিনি একাধিক মধ্য-ডান ও ডানপন্থী দলের আনুষ্ঠানিক সমর্থন নিশ্চিত করেছেন। প্রথম দফার নির্বাচনের পর থেকে পাওয়া এই সমর্থন তাঁর জোটকে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছে। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে তাঁর প্রচারণায় নতুন গতি এসেছে। তিনি জিতলে সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন জোটটি কেমন হতে পারে, তারও একটি প্রাথমিক রূপ দেখা যাচ্ছে। ফলে তিনি প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসলে তাঁর জোট কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পথে রয়েছে। গত সপ্তাহে মিত্রদলগুলোর আইনপ্রণেতা ও সদস্যদের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে ফ্লাভিও বলেন, ‘এই আনুষ্ঠানিক সমর্থনে আমি খুবই আনন্দিত। এসব দলের কিছু আইনপ্রণেতা আগে লুলার প্রশাসনে মন্ত্রিসভার পদসহ নানা প্রভাবশালী দায়িত্বে ছিলেন। জেমার দলে ‘নোভো’ও বোলসোনারোকে সমর্থন দিয়েছে। চলতি মাসের নির্বাচনের পর কংগ্রেসে ডানপন্থীদের প্রভাব বাড়লে এ ধরনের সমঝোতা করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর জ্যেষ্ঠ পুত্র ফ্লাভিও প্রথম দফার ভোটে লুলার চেয়ে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থেকে চমক সৃষ্টি করেছিলেন। এবার পিপি, উনিয়াও ব্রাসিল, রিপাবলিকানোস এবং পোদেমোস-এর মতো দলগুলো তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া মিনাস জেরাইসের সাবেক গভর্নর রোমেউ জেমা, গোয়াসের সাবেক গভর্নর রোনালদো কায়াদো এবং লেখক অগুস্তো কুরিও তাঁর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আন্তোনিও ফ্লাভিও টেস্টা মনে করছেন, এই জোট ২০২৮ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে। তবে সরকারে যেকোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা এলে তা এই জোটের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কংগ্রেসে শক্তিশালী অবস্থানের কারণে ফ্লাভিও এখন মুক্তবাজার অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। তিনি নিজে জানিয়েছেন, এই সমর্থন তাঁকে সংবিধান সংশোধন ও দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে সহায়তা করবে। যদিও তাঁর এই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন লুলার সমর্থকেরা। তাঁদের অভিযোগ, এটি ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি অশ্রদ্ধা। পরবর্তীতে ফ্লাভিও ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, তিনি কেবল আইনসম্মত সাংবিধানিক সংশোধনীর কথা বুঝিয়েছেন, যার জন্য ব্যাপক সংসদীয় সমর্থনের প্রয়োজন। আইন প্রণয়ন–সম্পর্কিত এজেন্ডাগুলো এগিয়ে নেওয়ার জন্য যিনিই প্রেসিডেন্ট হন না কেন, তাঁকে কংগ্রেসে একটি শক্তিশালী জোট গঠন করতে হয়। কংগ্রেসে সমর্থন থাকলে বিনিয়োগকারীরা যেসব মুক্তবাজার অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন, তা বাস্তবায়নে ফ্লাভিওর সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এভাবেই আমরা ব্রাজিলকে পুনর্গঠন করতে যাচ্ছি।’। এই সমর্থন ফ্লাভিওর উল্লেখযোগ্য প্রত্যাবর্তনকে চিহ্নিত করে। এর বাইরে যেকোনো ব্যাখ্যা স্রেফ অনুমাননির্ভর।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্লাভিও ক্ষমতায় গেলে তাঁর লিবারেল পার্টি (পিএল) এবং মিত্রদলগুলো মিলে নিম্নকক্ষে ২৮০টির বেশি এবং সিনেটে ৫০টি পর্যন্ত আসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কংগ্রেসে এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে তা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাঁর সরকারকে বাড়তি ক্ষমতা দেবে। এছাড়া নির্বাচনে হারার পর অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ২৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত নিজের বাবার মুক্তির পথ প্রশস্ত করাও ফ্লাভিওর অন্যতম রাজনৈতিক লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁর বাবা ২৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন।
এদিকে নিজের সরকার গঠনে ফ্লাভিওকে মিত্রদলগুলোর সাথে সমঝোতার মাধ্যমে মন্ত্রিসভায় রদবদল বা পদ ছাড়ার কৌশল নিতে হতে পারে। অতীতে জইর বলসোনারো সরকারকেও চরম রাজনৈতিক চাপে পড়ে মিত্রদের খুশি রাখতে একাধিকবার মন্ত্রিসভার সদস্য পরিবর্তন করতে হয়েছিল। ২০২৩ সালেও লুলা একই কাজ করেছিলেন, যখন তাঁর মন্ত্রিসভার প্রায় অর্ধেক পদ মিত্রদের ছেড়ে দিতে হয়েছিল। যেমন কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলার ধরন নিয়ে জইর বোলসোনারোর সরকার যখন চরম জনরোষের মুখে পড়েছিল, তখন মিত্রদের সমর্থন বজায় রাখতে তাঁকে বেশ কয়েকবার মন্ত্রিসভায় রদবদল করতে হয়েছিল।
অন্যদিকে, লুলা দা সিলভা দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে নতুন সমর্থন আদায়ে বেশ হিমশিম খাচ্ছেন। প্রথম দফার প্রচারণার আগেই তিনি বামপন্থী দলগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করে ফেলেছিলেন, কিন্তু এবার ভোট দিতে না আসা বা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তাঁকে দ্রুত নির্বাচনী কৌশল ঢেলে সাজাতে হচ্ছে। প্রথম দফায় বড় ধাক্কা খাওয়ার পর, প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, যেসব ব্রাজিলীয় ভোট দেননি তাঁদের কাছে পৌঁছাতে লুলা তাঁর নির্বাচনী প্রচার কৌশল তড়িঘড়ি করে ঢেলে সাজাচ্ছেন।

