বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে হুমায়ুন কবিরের শপথ গ্রহণের পর থেকেই তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত ২১ আগস্ট তিনি দায়িত্ব গ্রহণের শপথ নেন। এরপর ২৪ আগস্ট সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি সরাসরি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত না করে নিজেকে বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিয়ে দেশের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এই পরিস্থিতিতে তার নাগরিকত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা নিরসনে আইনি প্রক্রিয়া ও সরকারি নথির গুরুত্ব সামনে চলে এসেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। গত ২৫ আগস্ট তিনি জানান, হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন এবং তার শপথ গ্রহণ কোনো আইন লঙ্ঘন করেনি। সরকারের এই ভাষ্য অনুযায়ী, তার নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা নেই। তবে এই দাবির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নাগরিকত্ব ত্যাগের নিবন্ধিত ঘোষণাপত্র বা কার্যকর হওয়ার তারিখটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে চাইলে তাকে নির্দিষ্ট ‘নাগরিকত্ব ত্যাগের ঘোষণাপত্র’ বা রিনানসিয়েশন ফর্ম জমা দিতে হয়। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনটি গ্রহণের পর তা নিবন্ধন করা হয়। এই নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পরই নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি কার্যকর বলে গণ্য হয়। আবেদনকারীকে একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র দেওয়া হয়, যা প্রমাণ করে যে তিনি আর ব্রিটিশ নাগরিক নন।
নাগরিকত্ব ও অভিবাসন বিষয়ক আইনজীবী ড্যানিয়েল কোহেনের মতে, নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং এর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যুক্তরাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী, নাগরিকত্ব ত্যাগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব থাকা বা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হতে হয়। অর্থাৎ, নাগরিকত্বহীন অবস্থায় কেউ ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে পারেন না।
সাধারণ মানুষ বা সাংবাদিকদের জন্য ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি যাচাই করার কোনো উন্মুক্ত অনলাইন তথ্যভাণ্ডার নেই। ব্রিটিশ সরকার এ ধরনের তথ্য ব্যক্তিগত গোপনীয়তার খাতিরে উন্মুক্ত রাখে না। নাগরিকত্ব ত্যাগের নিবন্ধিত তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরেই সংরক্ষিত থাকে। ফলে, হুমায়ুন কবিরের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব ত্যাগের কার্যকর তারিখ নির্ধারণে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নিবন্ধিত ঘোষণাপত্রই হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।
বর্তমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এটি স্পষ্ট যে, কেবল নাগরিকত্ব ত্যাগের দাবিই যথেষ্ট নয়, বরং এর পেছনে থাকা আইনি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ। আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী বিষয়টির সুরাহা হলেও, নাগরিকত্ব ত্যাগের নিবন্ধিত নথির উপস্থিতিই এই বিতর্কের চূড়ান্ত সমাধান দিতে পারে।
পরিশেষে, বিতর্কের মূল বিষয় হওয়া উচিত তিনি ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন কি না বা তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো—তিনি যদি নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, তবে তার আইনি বৈধতা নিশ্চিত করার জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের দেওয়া নিবন্ধিত ঘোষণাপত্রটি জনসমক্ষে বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা।

