সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি ‘মক্কা চুক্তি’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন এক কৌশলগত আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ন্যাটোর আদলে গড়া এই যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর মাধ্যমে দেশগুলো পারস্পরিক সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি, পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র এবং সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে এই জোটের গুরুত্ব অনেক। তুরস্কের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশকেও এই চুক্তির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সৌদি আরব বাংলাদেশকে এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছে। যদিও এই আমন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট সময়কাল নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ঢাকা এ ধরনের উদ্যোগকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের নেতৃত্ব, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই উদ্যোগে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ব্লকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক নীতি অনুসরণ করে আসছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় শক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই ছিল ঢাকার মূল লক্ষ্য। এমন পরিস্থিতিতে একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের প্রচলিত পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল, তখন এই ধরনের সিদ্ধান্ত বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়ার মতে, বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হলে ভারতের পাশাপাশি চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ নতুন করে সাজাতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়নের অধ্যাপক আসিফ শাহানের মতে, কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, শুধু অন্য দেশ কীভাবে সিদ্ধান্তটিকে দেখবে, সেটিই পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের একমাত্র ভিত্তি হওয়া উচিত নয়; বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশিদের জোর করে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে ঢাকা। যদিও এই প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হলেও এখনো ভারতের চূড়ান্ত জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে সরকার। অন্যদিকে, নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর তার বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশ নিয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে।
মক্কা চুক্তি সম্পর্কে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, নয়াদিল্লি পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিলে ভারতের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে জল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়েও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এর মধ্যেই বাংলাদেশ নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হঠাৎ বন্যা ও বরফধসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নেপালের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের জন্য এখন মূল প্রশ্ন শুধু মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া বা না দেওয়া নয়; বরং এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব কি না, যার মাধ্যমে নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা যায়। মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা তাই বাংলাদেশের সামনে একটি জটিল ভারসাম্যের প্রশ্ন তৈরি করেছে। একদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধির সুযোগ, অন্যদিকে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করাই এখন ঢাকার সামনে বড় পরীক্ষা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা জোট গড়ে উঠলে বাংলাদেশ তাতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে আমন্ত্রণটি ঠিক কখন দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় ওই সূত্র পরিচয় প্রকাশ করতে চায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থাৎ কোনো সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে জোটের সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি কেবল দ্বিপক্ষীয় বা আঞ্চলিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাবও জড়িয়ে আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশির পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কোনো সিদ্ধান্ত যাতে বাণিজ্য ও শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেটিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তার মতে, এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে পড়বে—এমন নয়; কিন্তু বাংলাদেশ কোন পক্ষের অবস্থানে রয়েছে, সেই প্রশ্নটি তখন সামনে চলে আসবে।

