সংগীতে রাজনৈতিক বক্তব্য: শিল্পীদের মতভেদ ও নতুন বিতর্ক

সংগীত এবং রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে বিশ্বজুড়ে সংগীতাঙ্গনে নতুন করে তীব্র মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পীরা তাদের গানের মঞ্চে বা কনসার্টে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করবেন কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশ গায়ক এড শিরানের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরে ঘটা একটি ঘটনা এই বিতর্ককে কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে সংগীতের বিষয়বস্তুরও সম্পর্ক রয়েছে। বিলবোর্ডের জনপ্রিয় গানের কথার বিশ্লেষণেও সংগীতের এই তুলনামূলক বিষণ্ন প্রবণতার কথা উঠে এসেছে।

ঘটনার সূত্রপাত মার্কিন র‍্যাপার ম্যাকলমোরকে ঘিরে। গত ৪ সেপ্টেম্বর নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি ফিলিস্তিনের সমর্থনে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এই ঘটনার পর তাকে শিরানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের বাকি কনসার্টগুলো থেকে বাদ দেওয়া হয়। আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী, কয়েকটি স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ ম্যাকলমোরকে মঞ্চে রাখার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফিনিয়াস, লুকাস গ্রাহাম, অ্যারন রো এবং শিরানের ব্যাকিং ব্যান্ড বেওগার মতো সহযোগী শিল্পীরা সফর থেকে সরে দাঁড়ান। তারা ম্যাকলমোরের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এই বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, কয়েকটি স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ ম্যাকলমোরকে সঙ্গে রেখে অনুষ্ঠান করতে দিতে রাজি ছিল না।

তবে এড শিরান শুরু থেকেই নিজেকে এ ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরিয়ে রাখার পক্ষে কথা বলেছেন। তার মতে, তার কনসার্টগুলো দর্শকদের জন্য আনন্দ ও ঐক্যের স্থান হওয়া উচিত, যেখানে রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। তিনি দাবি করেন, কনসার্টে আসা দর্শকরা রাজনৈতিক ফোরামে অংশ নিতে আসেন না। এছাড়া ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার পেছনে তার নিজের কোনো হাত নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করেন। বিশেষ করে তরুণ শ্রোতাদের মধ্যে কনসার্টে রাজনৈতিক বক্তব্যের পক্ষে সমর্থন বাড়ছে।

অন্যদিকে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে শিল্পীদের নীরবতা নিয়েও পাল্টা প্রশ্ন উঠছে। গাজা যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান ডানপন্থী রাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তরুণ শ্রোতারা এখন শিল্পীদের কাছ থেকে স্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশা করছেন। ম্যাডোনার ২০০৩ সালের ‘আমেরিকান লাইফ’ গান বা তৎকালীন ইরাক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দ্য চিক্স-এর ওপর আসা রাজনৈতিক চাপের ঘটনার তুলনায় বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটা বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের দৌলতে রেডিও বা মূলধারার মাধ্যমের ওপর শিল্পীদের নির্ভরতা কমেছে, যা তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি করেছে। অতীতে মূলধারার সংগীতশিল্পীদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার চাপ ছিল বেশি। এর ফলে শিল্পীদের রাজনৈতিক স্বাধীনতাও বেড়েছে।

বর্তমান জনপ্রিয় সংগীতে ব্যক্তিগত হতাশা ও যন্ত্রণার পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতার মিশেল লক্ষণীয়। অনেক শিল্পী, যেমন বিলি আইলিশ বা আইরিশ গায়িকা সিএমএটি, বিভিন্ন ইস্যুতে প্রকাশ্যে অবস্থান নিচ্ছেন। সিএমএটির মতে, শিল্পীদের উচিত ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সময়কে তুলে ধরা। যদিও এ ধরনের চর্চা নিয়ে বিতর্ক চলমান।

এই বিতর্কের মাঝেই ২০ সেপ্টেম্বর ফিলাডেলফিয়ায় আয়োজিত পরবর্তী কনসার্টে এড শিরান নতুন করে গাজা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি সেখানে বেসামরিক মানুষ ও শিশুদের প্রাণহানির ঘটনাকে ‘বিপর্যয়কর ও অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে অভিহিত করেন। একই সাথে তিনি পুনরায় জোর দেন যে, তার সংগীত ও অনুষ্ঠান সব সময় ঐক্য ও মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জায়গা হওয়া উচিত। মূলত শিল্পীর ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং কনসার্টের পরিসরে রাজনৈতিক বার্তার প্রভাব নিয়ে নতুন করে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা সংগীত ও রাজনীতিকে আলাদা রাখার পুরোনো ধারণাকে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।