সরকারের নির্বাহী আদেশে সুপ্রিম কোর্টের নবগঠিত পৃথক প্রশাসনিক সচিবালয় আকস্মিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে সেখানে প্রেষণে কর্মরত ১৫ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই পদক্ষেপ দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনবিদ ও আইনজীবীদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, যারা এটিকে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের পরিপন্থী বলে দাবি করছেন।
সরকার পক্ষ জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে জারি করা ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ’টি বর্তমান জাতীয় সংসদে আইন হিসেবে পাস না হওয়ায় এবং সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুনির্দিষ্ট সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া এই ঘটনার আইনি ও রাজনৈতিক সংশয় সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ক্ষমতাসীন দলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান এবং বর্তমান নীতিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে রাজপথে ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অত্যন্ত সোচ্চার থাকার পর, ক্ষমতায় এসে বিএনপির এই বিপরীতমুখী অবস্থান অনেকের কাছে অসংগতিপূর্ণ মনে হচ্ছে। পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা অধ্যাদেশ দুটি সম্পূর্ণ বাতিলের জন্য জাতীয় সংসদে বিল তোলা এবং বাতিল করা, ক্ষমতাসীন বিএনপির বিরুদ্ধে তাদের আগের অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসার একটি স্পষ্ট অভিযোগ তৈরি করছে। এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি আগের প্রতিশ্রুতিগুলো শুধুই ক্ষমতায় আসার একটি সুকৌশলী রাজনৈতিক কৌশল ছিল?
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন) বর্তমান সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রথমে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরবর্তীতে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন যে, তিনি সরকারের কোনো অংশ নন, তাই এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। তবে বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। কারণ, এই বিষয়টি জনগণের কাছে স্পষ্ট না করলে দল হিসেবে বিএনপি সমালোচনার মুখে পড়বে বলে তিনি মনে করেন।
সঙ্কটের নেপথ্যে অধ্যাদেশ পর্যালোচনা প্রক্রিয়া
এই আইনি ও প্রশাসনিক সঙ্কটের নেপথ্যে রয়েছে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার দীর্ঘ প্রক্রিয়া। জাতীয় সংসদের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি এই অধ্যাদেশগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। কমিটি ৯৮টি অধ্যাদেশ সরাসরি এবং ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে সংসদে বিল হিসেবে উত্থাপনের সুপারিশ করলেও, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশসহ বাকি ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল কিংবা এই মুহূর্তে সংসদে না তোলার সুপারিশ করে। সংসদীয় কমিটির এই সুপারিশের ফলেই মূলত বিগত সরকারের সময় বাস্তব রূপ নেওয়া কাঠামোটি আইনি ভিত্তি হারিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্তির মুখে পড়েছে।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনার লঙ্ঘন ও আদালত অবমাননার অভিযোগ
আইনজীবীদের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রশ্ন নয়, বরং এটি দেশের চলমান আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়াকেও একটি বড় ধরনের জটিলতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ইতোমধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সুয়োমোটো বা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী তিন মাসের মধ্যে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ বা বর্তমান সরকার যেহেতু এখনো সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে কোনো ধরনের আপিল বা স্থগিতাদেশের আবেদন দায়ের করেনি, তাই সচল সচিবালয়ের কার্যক্রম এভাবে আকস্মিকভাবে গুটিয়ে নেওয়া আদালতের নির্দেশনার স্পষ্ট পরিপন্থী। সরকারবিরোধী আইনজীবীরা এই পদক্ষেপকে মারাত্মক আদালত অবমাননার শামিল বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, একদিকে আদালতে কার্যক্রম সচল রাখার মৌখিক আশ্বাস ও অন্যদিকে বাস্তবে প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে তা ভেঙে দেওয়ার এই দ্বৈত অবস্থান বিচার বিভাগের প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করবে।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের ১৫ বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার অফিস আদেশের বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘সরকার যা করেছেন, এটি সিরিয়াস আদালত অবমাননা।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই সচিবালয়ে যাকে সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তিনি থেকে শুরু করে ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার ইচ্ছে করে বিচার বিভাগের সাথে একটা সংঘাত লাগাতে চায়।’ হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা (সচিবালয় প্রতিষ্ঠা) এখনো বহাল উল্লেখ করে শিশির মনির বলেন, যে রিটটি (সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন নিয়ে) বিচারাধীন আছে, তা ৭ জুনের পর শুনানির জন্য আসবে। অ্যাটর্নি জেনারেল সেদিন (২০ এপ্রিল) আদালতে মৌখিকভাবে আশ্বস্ত করেছিলেন আর আদালত বলেছিলেন, তাদের চাওয়া যেন এ সময়ের ভেতরে সচিবালয়কে বিলুপ্ত করা না হয়। এই প্রত্যাশার প্রতি সরকার বিন্দু পরিমাণ শ্রদ্ধা দেখায়নি।
ভিন্নমত ও ভবিষ্যৎ সংস্কারের সম্ভাবনা
অবশ্য এই প্রশাসনিক বিলুপ্তির পেছনে একটি সুদূরপ্রসারী আইনি সংস্কার এবং বিচার বিভাগের ভেতরে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ভারসাম্য রক্ষার সম্ভাবনা দেখছেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি ফয়সাল মাহমুদ ফয়েজি। তিনি দলটির রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফার ১০ নম্বর দফার কথা উল্লেখ করে স্মরণ করিয়ে দেন যে, যেখানে সংবিধান ও ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা ও সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় নিশ্চিত করার স্পষ্ট ওয়াদা রয়েছে। জনগণ ম্যান্ডেট দেওয়ায় বিএনপি সেই ওয়াদা পূরণ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা আগের অধ্যাদেশের কিছু কাঠামোগত ত্রুটি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এটি বাতিলে যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বিচার বিভাগকে যদি স্বাধীন করতে চান সংবিধানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী, তাহলে বিচার বিভাগ পরিচালনার পুরা ব্যবস্থাটাকেই আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা করতে হবে। তা না হলে কোনোমতেই স্বাধীনতা আনতে পারবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু ২০০৭ সালে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠনের আগে নিয়োগ পাওয়া বিচারকরা সেই ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রেরই অংশ। তারা এই পৃথক সচিবালয়কেও সেই আমলাতান্ত্রিকতাতেই পরিচালনা করে প্রধান বিচারপতি থেকেও একটা বড় মহিরূহ বা ‘রাসপুতিন’ (নেপথ্য নিয়ন্ত্রক)-এ পরিণত করতে পারতেন।’ ফয়েজি উল্লেখ করেন, ‘২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে এই আইন (পৃথক সচিবালয় অধ্যাদেশ) প্রণয়নের সময় বিচারকদের বা আইনবিদদের তেমন রোল প্লে করার সুযোগ ছিল না। একমাত্র সুপ্রিম জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের অধীনে পরীক্ষা দিয়ে যারা এসেছেন, তাদের মধ্যে ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের প্রভাব কম। সুতরাং ওই তরুণ জেনারেশনটাই সচিবালয়ের দায়িত্বে আসা উচিত। আমার বিশ্বাস বিএনপি সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে এমনভাবে এই পৃথক সচিবালয় বিল আনবে, যা দ্বারা এটি কোনো ‘কোয়াজি-বুরোক্রেটিক’ (ছদ্ম-আমলাতান্ত্রিক) সচিবালয় সৃষ্টি করবে না।’
সরকার ও বিএনপির নীতিগত অবস্থান
বিপরীতে, বিএনপি এবং সরকার পক্ষের নীতিগত ও আইনি অবস্থান হলো, অধ্যাদেশটি নির্ধারিত সাংবিধানিক সময়ের মধ্যে সংসদে বিল আকারে পাস না হওয়ায় এবং এর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাওয়ায় বিচারকদের মূল মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া একটি ‘স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া’ মাত্র। বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপ কোনোভাবেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং তাড়াহুড়ো না করে আরও গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অংশীজন ও প্রথিতযশা আইনবিদদের মতামত নিয়ে ভবিষ্যতে একটি সর্বজনগ্রাহ্য, ত্রুটিমুক্ত ও বিতর্কহীন স্থায়ী আইন প্রণয়ন করার লক্ষ্যেই বর্তমান কাঠামোটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নতুন সংসদে বিল পাসের মাধ্যমেই একটি শক্তিশালী সচিবালয় আত্মপ্রকাশ করবে।
বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা
দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রক্ষমতার সুনির্দিষ্ট পৃথককরণ নীতির যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, তার সফল ও বাস্তব বাস্তবায়নে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্কের মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে দেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা এখনো কতটা ভঙ্গুর। এক সরকারের সংস্কারমুখী উদ্যোগ পরবর্তী সরকার এসে বাতিল করে সম্পূর্ণ নতুনভাবে শুরু করার এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে রাষ্ট্রের বিপুল সময়, অর্থ ও প্রশাসনিক সক্ষমতার অপচয় ঘটে এবং দিনশেষে সাধারণ নাগরিকরাই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। বিচার বিভাগের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে সরকার এখন কত দ্রুত সংসদে একটি টেকসই ও গ্রহণযোগ্য স্থায়ী বিল উত্থাপন করে, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের স্বাধীন বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।
