সংগীতে রাজনীতির চর্চা: এড শিরান ও ম্যাকলমোরের বিতর্ক

সংগীতের মঞ্চে রাজনৈতিক ও সামাজিক বক্তব্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সংগীতাঙ্গনে স্পষ্ট বিভাজন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ব্রিটিশ পপ তারকা এড শিরানের সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এই বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে। ঘটনার সূত্রপাত মার্কিন র‍্যাপার ম্যাকলমোরকে ঘিরে। গত ৪ সেপ্টেম্বর নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক কনসার্টে ম্যাকলমোর ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বক্তব্য রাখেন। এরপরই তাকে শিরানের সফরের পরবর্তী অনুষ্ঠানগুলো থেকে বাদ দেওয়া হয়। আয়োজকদের দাবি ছিল, বেশ কিছু স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ ম্যাকলমোরের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান করতে রাজি ছিল না।

ম্যাকলমোরকে সফর থেকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে শিরানের দলের অনেক সহযোগী শিল্পী সরে দাঁড়ান। তাদের মধ্যে ফিনিয়াস, লুকাস গ্রাহাম, অ্যারন রো এবং শিরানের ব্যাকিং ব্যান্ড বেওগা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা ম্যাকলমোরের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। এদিকে এড শিরান শুরুতে এই বিতর্ক থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, তার কনসার্টগুলো মূলত মানুষের আনন্দ ও ঐক্যের জায়গা, যেখানে দর্শকরা রাজনৈতিক ফোরামের মতো বিষয়বস্তু প্রত্যাশা করেন না। শিরান দাবি করেন, ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার পেছনে তার নিজস্ব কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না।

তবে ২০ সেপ্টেম্বর ফিলাডেলফিয়ায় আয়োজিত সফরের পরবর্তী কনসার্টে শিরানের অবস্থানে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সেখানে তিনি গাজা পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খোলেন। তিনি গাজায় বেসামরিক নাগরিক ও শিশুদের প্রাণহানিকে ‘বিপর্যয়কর ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন যে, তার অনুষ্ঠানগুলো যেন সর্বদা মানবতার কথা বলার ক্ষেত্র হিসেবে টিকে থাকে। এই ঘটনা শুধু একটি সফর নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি শিল্পীর সামাজিক দায়বদ্ধতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শ্রোতাদের প্রত্যাশার মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

আধুনিক সংগীতজগতে শিল্পীদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তরুণ শ্রোতাদের আগ্রহ ও প্রত্যাশা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। গাজা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের মতো ইস্যুগুলোতে তারকারা নীরব থাকলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষী দেয়, অতীতে মূলধারার শিল্পীদের জন্য রাজনীতি থেকে দূরে থাকার অলিখিত চাপ ছিল প্রবল। ২০০৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করে ম্যাডোনার ‘আমেরিকান লাইফ’ গান ও ভিডিও তীব্র প্রতিকূলতার মুখে পড়েছিল। একই সময়ে ইরাক যুদ্ধের সমালোচনা করায় ‘দ্য চিক্স’ ব্যান্ডের ওপর বড় ধরনের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা নেমে এসেছিল।

বর্তমানে ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে শিল্পীদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অনেকটাই বেড়েছে। রেডিও কিংবা মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়ায় কোনো শিল্পীকে এখন চাইলেই আগের মতো কোণঠাসা করা সম্ভব নয়। ফলে আইরিশ গায়িকা সিএমএটির মতো শিল্পীরা স্পষ্টতই বলছেন, শিল্পীদের উচিত তাদের সময়কে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সংগীতের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা। বিলি আইলিশের মতো তারকারাও এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে সরব। বর্তমান সংগীতের বিষয়বস্তুও পরিবর্তিত হয়েছে; ব্যক্তিগত বিষণ্নতা, একাকিত্ব ও সামাজিক যন্ত্রণার প্রতিফলন এখন জনপ্রিয় গানের কথায় মিশে থাকছে। এই প্রবণতা শিল্পীদের বৃহত্তর সামাজিক সংকট নিয়ে কথা বলার জায়গা তৈরি করে দিচ্ছে, যা সংগীত ও রাজনীতির চিরচেনা সম্পর্ককে নতুন প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি বলেন, তার কনসার্টে আসা দর্শকেরা রাজনৈতিক ফোরামে অংশ নিতে আসেন না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সময় ইরাক যুদ্ধ ও তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সমালোচনা করে দ্য চিক্সও বাণিজ্যিকভাবে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ পরিবর্তনের সঙ্গে সংগীতের বিষয়বস্তুরও সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিলবোর্ডের জনপ্রিয় গানের কথার বিশ্লেষণেও সংগীতের এই তুলনামূলক বিষণ্ন প্রবণতার কথা উঠে এসেছে।