প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে সরকার ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের মধ্যে সচিবালয়ে দ্বিতীয় পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় আইনটির বিভিন্ন ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ সম্পাদক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। তাদের দাবি, খসড়ায় থাকা অনেক বিষয় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিপন্থী, বিশেষ করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিচার ও গ্রেপ্তারের বিধানটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অপপ্রয়োগের আশঙ্কায় তারা এই আইন সংশোধনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। খসড়া আইনে মোবাইল কোর্টের বিধান রাখারও বিরোধিতা পৃষ্ঠা ৮ কলাম ১ করেছেন সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতারা। গতকাল সচিবালয়ে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনায় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অংশীজনদের সঙ্গে সরকারের উদ্যোগে দ্বিতীয় পরামর্শ সভায় এমন মতামত দেয়া হয়।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করে বলেন, সরকার মিডিয়াকে লক্ষ্যবস্তু করে কোনো আইন করতে চায় না এবং গণমাধ্যমকর্মীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। তিনি জানান, খসড়া আইনটি যেন নিপীড়নমূলক না হয়, তা নিশ্চিত করতেই অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সরকার তা ইতিবাচকভাবে দেখছে। এর আগে বিষয়টি নিয়ে সরকারের অবস্থান সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সভা শেষে ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে সংশোধনী আনার জন্য একটা খসড়া বিল আমরা রেডি করেছিলাম। যারা সাইবার স্পেসে কাজ করেন, আইটি এক্সপার্ট তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলি।
সভা শেষে নোয়াব-এর সভাপতি ও প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি যথাযথ সংশোধন ছাড়া এই আইন পাস করা হয়, তবে দেশ এক বৃহৎ কারাগারে পরিণত হবে। তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাংবাদিক বিচার ও গ্রেপ্তারের বিধান বাতিলের দাবি জানান। ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম এ আইনের খসড়াকে বর্তমান সরকারের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন। তিনি মনে করেন, সরকার নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো আইন তৈরির পথে হাঁটছে, যা ভবিষ্যতে সংবাদপত্রের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।
সভায় এসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্সের (অ্যাটকো) মহাসচিব ও একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজসহ অন্য সাংবাদিক নেতারাও আইনটির বিভিন্ন ধারার সমালোচনা করেন। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, খসড়া আইনটি মৌলিক পরিবর্তনের জন্য বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পর্যালোচনা করা হবে। এজন্য সম্পাদক, সাংবাদিক প্রতিনিধি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে, যারা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ জমা দেবেন।
কমিটির ফোকাল কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদ। তিনি সাংবাদিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করবেন। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের নির্বাহী সম্পাদক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর খসড়াটি আবার ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করা হবে। এর আগে খসড়াটি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী, মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আসা মতামতগুলোও পর্যালোচনার জন্য সংকলন করা হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, আলোচনার মাধ্যমেই আইনটি এমনভাবে সমৃদ্ধ করা হবে যাতে সমাজের সব স্তরের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ সুরক্ষিত থাকে। আমরা মনে করি, সবার আলাপ-আলোচনার মধ্যদিয়ে আইনটা সমৃদ্ধ হবে।

