পথকুকুরের প্রতি কেন এত ঘৃণা ও বিদ্বেষ?

বাংলাদেশে পথকুকুরকে খাবার খাওয়ানো বা তাদের চিকিৎসার উদ্যোগ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং শারীরিক হয়রানির ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে একশ্রেণির মানুষের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে, যা থেকে মনে হয় অসহায় প্রাণীকে খাবার দেওয়া যেন কোনো বড় অপরাধ। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পথকুকুরকে খাবার দেওয়া বা চিকিৎসা করানো মানুষদের নিয়ে কটূক্তি, হুমকি, অপমান ও শারীরিক হয়রানির অভিযোগ নতুন নয়। একটা বিড়াল দেখে অনেকে মায়া অনুভব করেন।

কুকুরের প্রতি মানুষের ভীতি কিংবা অপছন্দ থাকতেই পারে, কিন্তু এই অনুভূতি যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখনই প্রশ্ন ওঠে এর উৎসমূলে কী আছে। ঢাকার বনশ্রী এলাকায় গত ২২ সেপ্টেম্বর এ ধরনের এক ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হন সুমায়া রহমান। তিনি যখন কয়েকটি পথকুকুরকে খাবার দিচ্ছিলেন, তখন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) এ রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হন সুমাইয়া রহমান। ঢাকার বনশ্রী এলাকায় কয়েকটি পথকুকুরকে খাবার দেওয়ার সময় ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ রীতিমতো মব করে তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন (, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।

কুকুরের প্রতি এই চরম বিদ্বেষের অন্যতম কারণ হতে পারে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলা ভাষায় ‘কুকুর’ শব্দটি গালি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় প্রাণীটির প্রতি সহমর্মিতা দেখানো কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া শহরের রাস্তায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব এবং কুকুর নিয়ে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কারণে অনেকের মনে বিরক্তি জন্মাতে পারে। তবে ভয় আর ঘৃণা কখনোই এক নয়। এর একটি অংশ সম্ভবত সামাজিক অভ্যাসে। ‘কুকুর’ শব্দটা বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বড় গালিগুলোর একটি। যে প্রাণীর নাম দিয়ে মানুষকে ছোট করা হয়, তার প্রতি সহমর্মিতা গড়ে উঠবে কী করে। ছোট সন্তানকে নিয়ে উদ্বেগ থাকতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে কুকুরকে শহরের অস্বস্তিকর অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু কোনো সমস্যার অজুহাতে প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। কেন রাস্তায় অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য পড়ে থাকে কিংবা কেন কুকুরের টিকাদান ও জন্মনিরোধক কার্যক্রমের অভাব রয়েছে—সেসব নিয়ে প্রশ্ন তোলার বদলে সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কুকুরকে বেছে নেওয়া হচ্ছে।

ক্ষমতার প্রয়োগের বিষয়টিও এখানে প্রাসঙ্গিক। প্রাণীরা প্রতিবাদহীন, তাই তাদের ওপর রাগ ঝাড়া সহজ। যিনি তাদের খাওয়ান, তিনি প্রায়ই একা বা সমাজের চোখে ‘বাড়াবাড়ি’ করা কোনো ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন। এ ছাড়া আমাদের সমাজে প্রাণীর প্রতি মমতাকে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা বলে মনে করা হয়। কিন্তু মানবিকতা কোনো সীমিত সম্পদ নয়; একজন মানুষ একই সঙ্গে মানুষের জন্য কাজ করে আবার একটি আহত প্রাণীকে চিকিৎসাও দিতে পারেন। একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো বিরোধ নেই। পাখিকে খাবার দিলে সেটিকে ভালো কাজ বলে মনে করা হয়।

প্রাণীর প্রতি মমতাবোধ দেখানো মানেই মানুষের প্রতি উদাসীন হওয়া নয়। যিনি নিজের সময় ও অর্থ ব্যয় করে ক্ষুধার্ত প্রাণীকে সাহায্য করেন, তিনি মূলত দায়িত্ববোধের পরিচয় দেন। তাঁর পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু সেই মানবিকতাকে অপমান করার কোনো অধিকার কারও নেই। আজ কুকুরপ্রেমীদের হেনস্তা করা হচ্ছে, কাল অন্য কোনো নাগরিককেও ভিন্ন কোনো কারণে আক্রান্ত হতে হতে পারে।

কুকুরকে ভালোবাসতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, কিন্তু ঘৃণার নামে মানুষকে নির্যাতন করার অধিকার কারও নেই। একইভাবে প্রাণীপ্রেমীদেরও সচেতন হতে হবে, যাতে খাবার দেওয়ার সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকে এবং পথচারীদের চলাচলের অসুবিধা না হয়। ড. মো. আবু নাসের, যিনি ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ারপারসন, তিনি মনে করেন, কুকুর আপনার প্রিয় প্রাণী না হতে পারে, কিন্তু সে ক্ষুধার্ত হলে তাকে খাবার দেওয়া মানুষটিকে লাঞ্ছিত করার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই।