বাংলাদেশের খুদে শিক্ষার্থী আনান মুস্তাফিজ আবারো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য পেয়েছেন। রয়্যাল কমনওয়েলথ সোসাইটির আয়োজনে বিশ্বখ্যাত কুইন্স কমনওয়েলথ রচনা প্রতিযোগিতায় টানা দ্বিতীয়বারের মতো তিনি এ স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। রাজধানীর অ্যাপল ট্রি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর অর্জিত সাফল্যটি ইমেইলের মাধ্যমে তাকে নিশ্চিত করেছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ।
আনানের প্রতিযোগিতামূলক রচনার শিরোনাম ছিল ‘দ্য রিদম অব আইডেন্টিটি’। এতে তিনি কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক সংস্কৃতি বিনিময়ের চিত্র তুলে ধরেছেন। গল্পে উঠে এসেছে বৃষ্টিভেজা এক বিকেলে জ্যামাইকান কিশোরী আমারা ও আনানের কথোপকথন। খাবারের মাধ্যমে কীভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস, নদীমাতৃক প্রকৃতি, কৃষি, জীবনযাত্রার ধরন এবং উৎসবের ঐতিহ্য তুলে ধরা যায়, তা তিনি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন এবং রবীন্দ্রসংগীত, লালনগীতি, ভাওয়াইয়া ও ভাটিয়ালির মতো বৈচিত্র্যময় বাংলা গানের প্রসঙ্গও লেখায় স্থান পেয়েছে। জ্যামাইকান শিল্পী বব মার্লের গানের প্রতি বাংলাদেশিদের মুগ্ধতার কথা শুনে আমারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিল। আনানের ভাষায়, অন্য কোনো দেশের মানুষের সঙ্গে সংস্কৃতি শেয়ার করার মাধ্যমে নিজের শেকড় ও সংস্কৃতিকে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ হয়। আমারাকে আনান জানান, ‘বাংলাদেশের মানুষ যে জ্যামাইকার কিংবদন্তী শিল্পী বব মার্লের গান ভালোবাসে’। আনান লিখেছেন, বৃষ্টিভেজা এক বিকেলে জ্যামাইকান কিশোরী আমারার সাথে তার পরিচয় ঘটে এবং মেয়েটি বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি সম্পর্কে জানতে চায়। ভাত, ডাল, বেগুন ভাজা ও ইলিশের মতো খাবারের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের নদী, কৃষি, মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং উৎসবের ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেন। দুজনের কথোপকথনে বাংলাদেশের সঙ্গে জ্যামাইকার সংস্কৃতির মিল, পারস্পরিক আগ্রহ এবং কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উঠে আসে। আনান তার লেখা শেষ করেন এই বলে, ‘আমারা বিদায় নেওয়ার পর আনান উপলব্ধি করেন, অন্য একটি দেশের মানুষের সঙ্গে সংস্কৃতি ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে নিজের দেশ ও সংস্কৃতিকেও নতুনভাবে আবিষ্কার করা যায়।’।
পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় আর্ট নিউজকে আনান জানান, গত এপ্রিলে যখন তিনি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন, তখনই রচনাটি জমা দিয়েছিলেন। গত বছর গোল্ড অ্যাওয়ার্ড পেলেও এবার ব্রোঞ্জ মেডেল পাওয়ায় কিছুটা হতাশা কাজ করলেও, এটি তার জন্য ভবিষ্যতে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা। রয়্যাল কমনওয়েলথ সোসাইটি তাকে পদকের পাশাপাশি সনদের ডিজিটাল কপিও পাঠিয়েছে। ১৮৮৩ সাল থেকে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় এ বছর ৫৬টি সদস্য দেশের ৫৩ হাজার ৮৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর ৪০৬ জন প্রতিযোগী বেশি ছিল, যা নতুন এক রেকর্ড। আর্ট নিউজকে আনান জানান, ‘গত এপ্রিল মাসে গ্রেড ফাইভ-এ পড়ার সময়ই তিনি রচনাটি পাঠিয়েছিলেন। ১৮৮৩ সাল থেকে রয়্যাল কমনওয়েলথ সোসাইটি স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি বছর এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। চলতি বছর কমনওয়েলথের ৫৬টি সদস্য দেশের ৫৩ হাজার ৮৪০ জন শিক্ষার্থী এই প্রতিযোগিতায় সিনিয়র ও জুনিয়র গ্রুপে অংশ নেয়।
আনান মুস্তাফিজের বহুমুখী প্রতিভার পরিচিতি রয়েছে আগেই। ২০২৩ সালে ১৪ হাজার শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত স্মার্ট চিলড্রেন কার্নিভালের কুইজ প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। এছাড়া নিজের ইউটিউব চ্যানেল ‘মুগলি’স ওয়ার্ল্ড’-এ ‘টক উইথ আনান’ শিরোনামে সেলিব্রেটিদের নিয়ে টক শোর উপস্থাপনা করেন তিনি। লেখালেখির পাশাপাশি নিয়মিত উপস্থাপনার সঙ্গেও যুক্ত আছেন এই খুদে মেধাবী।
আনানের এমন সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে তার পরিবার। তার বাবা রহমান মুস্তাফিজ একজন সিনিয়র সাংবাদিক এবং মা কাজী তামান্না আর্ট নিউজের প্রকাশক ও সম্পাদক, যিনি একই সঙ্গে সংবাদ উপস্থাপক ও চিত্রশিল্পী হিসেবে পরিচিত। তার এই অর্জন দেশের জন্য এক গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

