স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, টেলিভিশন কিংবা ফ্রিজের মতো ইলেকট্রনিক সামগ্রী বর্তমান জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির বিস্তার জীবনকে সহজ করার পাশাপাশি কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে। তবে ব্যবহারের নির্দিষ্ট মেয়াদকাল পার হলে বা নষ্ট হয়ে গেলে এসব বৈদ্যুতিক যন্ত্রের পরিবেশবান্ধব উপায়ে বর্জ্য অপসারণ ও ব্যবস্থাপনা বড় একটি বৈশ্বিক সংকট তৈরি করছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, বাড়িয়েছে উৎপাদনশীলতা ও যোগাযোগের সুযোগ।
অনুপযোগী এবং ফেলে দেওয়া এসব ইলেকট্রনিক পণ্যকে এককথায় বলা হয় ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য। প্রক্রিয়াজাত না করা ই-বর্জ্যে তামা, লোহা, অ্যালুমিনিয়ামের পাশাপাশি সোনা ও রূপার মতো মূল্যবান ধাতুও সঞ্চিত থাকে। একই সময়ে এতে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিকের মতো অত্যন্ত বিষাক্ত এবং মানবদেহের জন্য বিপজ্জনক উপাদানও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
খোলা জায়গায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে পুরোনো যন্ত্রপাতি পোড়ানো কিংবা অপরিকল্পিত উপায়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার ফলে ক্ষতিকর উপাদানগুলো মাটি, পানি ও বাতাসের সঙ্গে মিশে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটায়। এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত শ্রমিক ও পথচারীদের স্বাস্থ্য চরম ঝুঁকিতে পড়ে। অপরদিকে, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা গেলে বিষাক্ততার বিস্তার রোধের পাশাপাশি কাঁচামাল হিসেবে ধাতব পদার্থ ও প্লাস্টিক উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে। অন্যদিকে, ই-বর্জ্যকে শুধু আবর্জনা হিসেবে না দেখে এর সঠিক প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ থেকে মূল্যবান ধাতু, প্লাস্টিক ও অন্যান্য উপাদান পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এই পরিসংখ্যানকে পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বর্জ্য-পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করার আগে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও সীমাবদ্ধতা যাচাই করা প্রয়োজন। (৪ ) নিরাপদ পুনর্ব্যবহার ও সম্পদ পুনরুদ্ধার। এরপর পুনরায় ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রপাতি মেরামত করে নতুন ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছানো হয় এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান আলাদা করে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (ITU) এবং জাতিসংঘের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের (UNITAR) যৌথভাবে প্রকাশিত ‘দ্য গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট মনিটর ২০২৪’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়েছিল। এই বিপুল বর্জ্যের মধ্যে মাত্র ২২.৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে সংগ্রহ করে পরিবেশসম্মত উপায়ে পুনর্ব্যবহার করার নথিপত্র রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে জানানো হয়েছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ আন্তর্জাতিকভাবে প্রতি বছর ই-বর্জ্যের পরিমাণ ৮ কোটি ২০ লাখ টনে গিয়ে পৌঁছাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উল্লেখ করেছে, ই-বর্জ্যে মূল্যবান সম্পদের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও এতে থাকা ক্ষতিকারক রাসায়নিক মানবস্বাস্থ্য ও প্রকৃতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের পে প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিধি বাড়লেও মেয়াদ উত্তীর্ণ ইলেকট্রনিক পণ্য সংগ্রহ, আলাদা করা ও পরিবেশবান্ধব নিষ্পত্তির সুনির্দিষ্ট পরিকাঠামো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। পুরোনো মোবাইল, ব্যাটারি, কম্পিউটার ও গৃহস্থালি ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক পণ্য সাধারণত খোলা বাজারে অপেশাদার সংগ্রাহক ও ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে আংশিক পুর্নব্যবহারের জন্য কেনাবেচা করা হয়। এতে কাজের সার্বিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও এসব পণ্যের জীবনচক্র শেষে সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্ত নয়। জাপান: পুরোনো পণ্য ফেরত ও পুনর্ব্যবহার। 2. এতে উৎপাদকরা বাধ্য হন ব্যবস্থা নিতে।
জাতীয় পর্যায়ে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আইনি ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ‘ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১’ প্রণয়ন করেছে। ১০ জুন ২০২১ তারিখে গেজেট আকারে প্রকাশিত এই নীতিমালায় ই-বর্জ্যের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায়নের পাশাপাশি প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক ও সংগ্রাহকদের দায়িত্ব এবং বর্জ্যের পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার আইনি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। বিধিমালার একটি বড় দিক হলো উৎপাদকের সম্প্রসারিত দায়বদ্ধতা বা এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপন্সিবিলিটি (ইপিআর)। ফলে ই-বর্জ্যের কার্যকর ব্যবস্থাপনা পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আমদানি নির্ভরতা হ্রাস এবং সম্পদের দক্ষ ব্যবহারে অবদান রাখতে পারে। বিদেশের সফল মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না করলে জরিমানা পুনর্ব্যবহারের খরচের চেয়ে বেশি হয়। তারা ইপিআর নিয়ম আপডেট করেছে এবং প্রডিউসার রেসপন্সিবিলিটি অর্গানাইজেশন গঠনের সুযোগ রেখেছে।
আইনি পরিকাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ২০২৫ সালের গবেষণা প্রতিবেদন ‘E-Waste Management in Bangladesh: Governance Challenges and Way Forward’-এ উল্লেখ করা হয়, দেশে বার্ষিক ই-বর্জ্য উৎপাদন এবং তা পুর্নব্যবহার সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্যের বড় ঘাটতি রয়েছে।
টিআইবি-র প্রতিবেদনে পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) পরিচালিত ২০১৭ সালের একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী, দেশে বার্ষিক প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ কেজি ই-বর্জ্য তৈরি হতো। মোট বর্জ্যের প্রায় ৯৭ শতাংশই সংগ্রহ করা হতো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের মাধ্যমে এবং সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় মাত্র ৩ শতাংশ বর্জ্য পুনরায় প্রক্রিয়াজাত কিংবা বিদেশে রপ্তানি করার সুযোগ মিলত। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধু নতুন আইন প্রণয়ন নয়, বরং বিদ্যমান আইন বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
ই-বর্জ্যের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা মূল্যায়নে দেখা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভুক্ত দেশগুলোতে বর্জ্য বৈদ্যুতিক এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি নির্দেশিকা বা ডব্লিউইইই নির্দেশিকা কার্যকর রয়েছে। এর আওতায় বর্জ্য পৃথককরণ ও রিসাইক্লিং মনিটরিং নিশ্চিত করা হয়। অন্যদিকে জাপানে উৎপাদক, আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের সরাসরি পুরোনো পণ্য ফেরতের দায়বদ্ধতা দেওয়া হয়েছে। ক্রেতারা নতুন সামগ্রী কেনার সময় নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনায় পুরোনো যন্ত্র ফেরত প্রদান করে থাকেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইপিআর নীতিমালায় প্রস্তুতকারকদের সংগ্রহ ও রিসাইক্লিং নিশ্চিতের নির্দিষ্ট লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে, লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে চড়া অঙ্কের আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে। একইভাবে ভারতেও উৎপাদকদের ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ ই-বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক এই উদ্যোগগুলো থেকে স্পষ্ট যে, উপযুক্ত নীতিমালা এবং বাজার ব্যবস্থার সংমিশ্রণ নিশ্চিত করতে পারলে ই-বর্জ্য থেকে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। অনিরাপদ ই-বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সৃষ্ট দূষণ বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশকে ই-বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ২০২১ সালের বিধিমালার কঠোর বাস্তবায়নে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, বিপণিবিতান ও প্রদেয় সার্ভিস সেন্টারগুলোতে সার্বজনীন ই-বর্জ্য জমা কেন্দ্র স্থাপন নিশ্চিত করা জরুরি। ইলেকট্রনিক প্রস্তুতকারক ও আমদানিকারকদের সামাজিক দায়িত্ব নিশ্চিতের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক সংগ্রহকারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদান এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে যুক্ত করতে পারলে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি অর্থনীতির নতুন দুয়ার উন্মোচিত হতে পারে।

