বেসরকারি চাকরিতে বেতন ‘আলোচনা সাপেক্ষে’: দর-কষাকষির উপায় কী

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে পদের নাম, গ্রেড ও বেতন স্কেল বিজ্ঞপ্তিতেই নির্দিষ্ট করে দেওয়া থাকে, ফলে আবেদনকারীরা শুরুতেই আর্থিক ধারণা পান। কিন্তু বেসরকারি খাতের চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। সেখানে পদের দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার বিশদ বর্ণনা থাকলেও বেতনের ক্ষেত্রে ‘আলোচনা সাপেক্ষে’ বা ‘আকর্ষণীয় বেতন’-এর মতো অস্পষ্ট শব্দ লেখা থাকে। গুটিকয়েক ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ বেসরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে বেতনের কোনো নির্দিষ্ট অংক উল্লেখ থাকে না, যা বর্তমান চাকরির বাজারে এক অলিখিত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

বেতন কত হবে তা না জেনে আবেদন করার ফলে হাজারো তরুণ, বিশেষ করে সদ্য স্নাতক হওয়া প্রার্থীরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন। অভিজ্ঞতা না থাকায় কোন পদের জন্য কত বেতন দাবি করা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা থাকে না। এছাড়া চাকরির শুরুতেই বেতন নিয়ে প্রশ্ন তুললে নিয়োগদাতার কাছে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেও অনেকে চুপ থাকেন। মাহফুজ রহমান ও সিদ্ধার্থ রায়ের মতো অসংখ্য চাকরিপ্রার্থী বিজ্ঞপ্তিতে বেতন না থাকায় আবেদনের ক্ষেত্রে দ্বিধায় ভোগেন। কত টাকা বেতন পাওয়া যাবে, তা না জেনেই আবেদন করতে হচ্ছে হাজার হাজার তরুণকে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক হওয়া চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিষয়টি আরও জটিল। আবার নিয়োগ প্রাক্‌-সাক্ষাৎকারে বেতন নিয়ে প্রশ্ন করলে নিয়োগদাতার কাছে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হবে কি না, সেই আশঙ্কাও কাজ করে তাঁদের মনে। আরেক চাকরিপ্রার্থী সিদ্ধার্থ রায়ও বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছেন। বেশি বেতন চাইলে নিয়োগদাতা তাঁকে বাদ দিতে পারেন, আবার কম বেতন চাইলে নিজের যোগ্যতার যথাযথ মূল্য না-ও পেতে পারেন, এমন দুশ্চিন্তা থাকে।

চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এটি শুধু একটি চ্যালেঞ্জ নয়, বরং তথ্যগত অসমতার একটি বড় ক্ষেত্র।

বিজ্ঞপ্তিতে বেতন না থাকলে প্রার্থীরা তাদের যোগ্যতা ও বাজারের পরিস্থিতির সাথে মিল রেখে আর্থিক সুবিধা মূল্যায়ন করতে পারেন না।

বিশেষজ্ঞ ও আইসিডিডিআরবির মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মোশাররফ হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াটি এখনো পুরোপুরি পেশাদার রূপ পায়নি। তিনি জানান, বিজ্ঞপ্তিতে বেতন গোপন রাখার বিষয়টি কাম্য নয়। অনেক সময় বেশি উপার্জনের আশায় আবেদন করার পর চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রার্থী দেখেন যে, নিয়োগদাতার প্রস্তাবিত বেতন তার বর্তমান বেতনের চেয়েও কম, যা উভয় পক্ষের সময় ও শ্রম নষ্ট করে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বেতনের তথ্য গোপন রাখার প্রাতিষ্ঠানিক প্রথাকে অনৈতিক ও অপেশাদার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে দেখা যায়, নতুন প্রতিষ্ঠানটি আগের চেয়ে কম বেতনের অফার দিচ্ছে।

এ ধরনের অনিশ্চয়তা দূর করতে ও দর-কষাকষিতে দক্ষ হতে চাকরিপ্রার্থীদের কিছু প্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, একই ধরণের পদে অন্য প্রতিষ্ঠানে বেতন কাঠামো কেমন, তা পরিচিতজন বা সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যক্তিদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং নিজের দক্ষতা অনুযায়ী প্রত্যাশিত বেতনসীমা আগে থেকেই ঠিক করে রাখতে হবে। তৃতীয়ত, সাক্ষাৎকারের সময় প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত বেতনসীমা সম্পর্কে বিনয়ের সাথে জানতে চাওয়া যেতে পারে। যেমন: “এই পদের জন্য প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত বেতনসীমা সম্পর্কে আমি জানতে পারি কি?” এটি নিয়োগদাতার অবস্থান বুঝতে সহায়তা করবে। যাঁরা আগে থেকেই চাকরি করছেন, তাঁরাও নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে বর্তমান বেতন, যাতায়াত ব্যয়, কাজের সময় ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে তুলনা করতে চান। দর-কষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে কারা। এতে নিজের প্রত্যাশা জানানোর আগে নিয়োগদাতার অবস্থান বোঝা সহজ হবে। বাসাভাড়া, যাতায়াত, খাবারসহ মাসিক খরচের হিসাব করার পাশাপাশি পদের দায়িত্ব, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও বাজারদর বিবেচনায় রাখতে হবে।

চতুর্থত, শুধুমাত্র মূল বেতনের ওপর নির্ভর না করে উৎসব ভাতা, যাতায়াত ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও স্বাস্থ্যবিমার মতো সুযোগ-সুবিধাও গুরুত্বসহ বিবেচনা করতে হবে। পঞ্চমত, দর-কষাকষির সময় নিজের যোগ্যতা ও দায়িত্বের স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে হবে। একটি নির্দিষ্ট অংকে আটকে না থেকে বরং একটি যৌক্তিক বেতনসীমা প্রস্তাব করা বুদ্ধিমানের কাজ। নিয়োগদাতার প্রস্তাব প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে বেতন পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে কি না, তা-ও স্পষ্টভাবে জেনে নিতে পারেন।

চাকরির নিয়োগ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চট্টগ্রাম বন্দরে ৩৯৩ জনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, যার আবেদনের শেষ সময় ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এছাড়া বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন কর্মপদ্ধতি ও নিয়োগ নিয়ে নতুন নজির স্থাপন করা প্রতিষ্ঠানগুলোর খবরও নিয়মিত প্রকাশ পায়, যেমন ৭৫ বছর ছাঁটাই ছাড়াই চলছে এমন কোম্পানি বা কোটি টাকার ফেলোশিপ-বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করা আশফাকুর রহমানের সাফল্য। ৭৫ বছর ছাঁটাই ছাড়াই চলছে কোম্পানিটি; পরিচালনা পদ্ধতি দেখতে ভিড় সিইওদের।

পরিশেষে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বেতনের অংক থাকলে আবেদনকারীরা আগেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং উভয় পক্ষের সময় সাশ্রয় হয়। ‘আলোচনা সাপেক্ষে’ লেখা থাকলেও আলোচনাটি কখন, কোন ভিত্তিতে এবং কী সীমার মধ্যে হবে, সে সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকলে প্রার্থীরা বড় ধরনের বিড়ম্বনা এড়াতে পারবেন।