কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার সাথে জড়িয়ে আছে এদেশের অগণিত মানুষের শৈশবের স্মৃতি। ভোরবেলা মক্তবে যাওয়া, হুজুরের কাছে আলিফ-বা-তা শেখা কিংবা তারাবির নামাজে কিশোর হাফেজের সুললিত তিলাওয়াত শোনা—এসব আমাদের সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনেক শিক্ষার্থীই এই মাদ্রাসার আঙিনা থেকে বেরিয়ে সমাজের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তবে বর্তমানে কিছু উদ্বেগজনক অভিযোগ এই শিক্ষাব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। আমাদের অনেকেরই এমন বন্ধু বা স্বজন আছেন, যিনি কওমি মাদ্রাসার আঙিনা পেরিয়ে আজ সমাজের মূলধারায় নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। এই স্মৃতিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই শিক্ষাব্যবস্থা আর আমাদের সমাজকাঠামো আলাদা কিছু নয়। কওমি মাদ্রাসাকে ‘ওরা’ বলে আলাদা করে ফেলার আগে সংখ্যাগুলো দেখা দরকার। এখন এই হিসাবও অনুমাননির্ভর, কারণ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাই বিভিন্ন সময় স্বীকার করেছেন, কওমি মাদ্রাসা সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে না থাকায় তাঁদের কাছে এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য নেই। লাখো শিশুর আবাসন, খাওয়া, বইপত্র—প্রায় সবই চলে সমাজের মানুষের দানে। গ্রামের জানাজা, নিকাহ, দোয়া-মাহফিল থেকে শুরু করে সমাজের ধর্মীয় জীবনের বড় অংশ চলে এই ধারার মানুষদের হাত ধরে। চিকিৎসকের অপরাধে হাসপাতাল বা পুলিশের অপরাধে বাহিনীর সবাইকে আমরা কাঠগড়ায় তুলি না। সে কারণেই এই ধারাকে সমাজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো ইতিহাস ও বাস্তবতা—দুটোর সঙ্গেই অসংগত। অস্বস্তিকর প্রশ্নটা কওমি ধারাকেই করতে হবে। এখানে এসে প্রশংসার সুর ছেড়ে কিছু কঠিন কথায় যেতে হবে, কারণ সেটাই সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষীর কাজ।
সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনার দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী এক শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে অভিযুক্তদের তালিকায় ১০ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী রয়েছে। একই সময়ে সিলেট নগরীর একটি মাদ্রাসায় ১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আরবি বিভাগের এক শিক্ষক বর্তমানে কারাগারে আছেন। এছাড়া গত আগস্ট মাসে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আট বছরের এক শিশুকে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে এক এতিমখানা ও মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষককে র্যাব গ্রেপ্তার করেছে। এই চিরায়ত দৃশ্যটা মাথায় রেখেই সাম্প্রতিক খবরগুলোর দিকে তাকাই। সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছরের এক শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে; আসামির তালিকায় আছেন দুজন শিক্ষকসহ মাদ্রাসার ১০ জন ছাত্র ও শিক্ষক। শিক্ষক যিনিই হোন, যে প্রতিষ্ঠানেরই হোন, শিশুর ওপর নিপীড়নের একটাই নাম—জঘন্য অপরাধ। মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়ন: কোন থাপ্পড়ে মিলবে শিশুর সুরক্ষা। মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: আলেমসমাজ কি চুপই থাকবে।
যদিও এগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত অভিযোগ, কিন্তু শিশুদের ভয়, কান্না ও তাদের মাদ্রাসায় ফিরে না যাওয়ার অসহায় আকুতি কেবল অভিযোগ নয়, এটি একটি নিরেট বাস্তব। অপরাধের কঠোর বিচার নিশ্চিত করা জরুরি, তবে এই দাবি যেন পুরো একটি শিক্ষাধারার বিরুদ্ধে সামাজিক অবিশ্বাসের অস্ত্রে পরিণত না হয়।
কওমি মাদ্রাসার পরিসর বেশ বিস্তৃত। ব্যানবেইসের ২০১৫ সালের তথ্যমতে, ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদ্রাসায় প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। তবে বর্তমান সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বেফাকুল মাদারিসের পরিচালক উবায়দুর রহমান খান নদভির তথ্য অনুযায়ী, কেবল বেফাকের অধীনেই ৩২ হাজারের বেশি মাদ্রাসা নিবন্ধিত। দেশে ছয়টি প্রধান বোর্ড মিলে ৫০ হাজারের বেশি মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ২০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। ফলে ২০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পড়ালেখা করেন বলে অনেকে মন্তব্য করে থাকেন। বিত্তবান বা মধ্যবিত্তদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য নয় এখনো।
এই শিক্ষার্থীদের অধিকাংশেরই পরিবার নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পর্যায়ের। কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সন্তানরাই মূলত কওমি ধারার শিক্ষার মূল ভিত্তি। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনের মাধ্যমে আল-হাইআতুল উলয়ার অধীনে দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তরের সমমানের সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা এই ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বরং এদের বেশির ভাগই গ্রামের কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা রিকশাচালকের সন্তান। মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশে কে দাঁড়াবে।
স্বীকৃতি পাওয়ার সাথে সাথে জবাবদিহিতার বিষয়টি সামনে আসে।
যখন একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তখন শিশুটি কার কাছে অভিযোগ জানাবে?
অভিযুক্ত ব্যক্তিই যদি শিক্ষক, আবাসিক অভিভাবক এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতীক হন, তবে শিশুটির নিরাপত্তাহীনতা চরমে পৌঁছায়। বেশিরভাগ ঘটনায় ভয়ভীতি প্রদর্শন, বিশেষ শিক্ষার অজুহাতে ডেকে নেওয়া এবং দীর্ঘ নীরবতা বজায় রাখার মতো ভয়াবহ প্যাটার্ন দেখা যায়। এছাড়া ‘প্রতিষ্ঠানের সম্মান’ রক্ষার নামে অপরাধ চাপা দেওয়া বা সালিস করে সমঝোতার প্রবণতা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে। কোরবানির চামড়ার টাকা, রমজানে জাকাত, ধান কাটার মৌসুমে মুষ্টির চাল—এই চক্রই বহু প্রতিষ্ঠানের প্রাণ।
কোনো শিক্ষকের অপরাধ প্রমাণিত হলে দায় অবশ্যই সেই ব্যক্তির। তাকে আড়াল করা বা অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করাও সমান অপরাধ। তবে কোনো ব্যক্তির স্খলনের দায়ে পুরো শিক্ষাধারাকে অভিযুক্ত করা যুক্তিসঙ্গত নয়। যেমনটা অন্যান্য পেশাজীবী বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমরা করি না।
ইতিহাসে দেখা গেছে, আলেম-সমাজ কেবল ধর্মীয় শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং জাতীয় সংকটেও তারা ভূমিকা রেখেছেন। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার সময় এবং ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও আলেমদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতারই প্রমাণ। তাই অপরাধীকে চিহ্নিত করা এবং একটি শিক্ষাধারাকে সন্দেহ করা কখনোই এক হতে পারে না। প্রকৃত সংখ্যাটি এর চেয়ে অনেক বেশিও হতে পারে। তারপর ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে রক্ত দিয়ে কওমি মাদ্রাসার আলেম ও শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছেন ন্যায্য আন্দোলনে তারা ছাত্র-জনতার কাতারেই আছেন।
বর্তমানে প্রয়োজন কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে শিশুর পরিচয় গোপন রাখা হবে। প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় বাধ্যতামূলকভাবে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের অতীতের কাজের পটভূমি যাচাই এবং অভিভাবকদের পরিদর্শনের সুযোগ থাকা জরুরি।
আল-হাইআতুল উলয়া ও সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোর উচিত অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও বাধ্যতামূলক ‘শিশুসুরক্ষা নীতি’ প্রণয়ন করা। যে লাখো পরিবার পরম বিশ্বাসে তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠায়, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজেরও সম্মিলিত দায়। অপরাধীর যথাযথ শাস্তি ও প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতাই পারে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথে নিয়ে যেতে। কোরআনের একটি মৌলিক নীতি এখানে প্রাসঙ্গিক—‘কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না’ (সুরা বনি ইসরাইল: ১৫)।

