একটি পরিবারে নারী যখন নির্যাতনের শিকার হন, তখন কেবল তিনি নন, তার সন্তানেরাও সরাসরি এর ভুক্তভোগী হয়ে ওঠে। যদিও শিশুরা সরাসরি শারীরিক আক্রমণের শিকার নাও হতে পারে, তবুও মায়ের প্রতি সহিংসতা দেখে তাদের মনে যে ভীতি ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত তৈরি হয়, তার প্রভাব তাদের ভবিষ্যৎ জীবনেও পড়ে। একইভাবে পরিবারে যে শিশু নিয়মিত মারধর বা ভয়ের মধ্যে বড় হয়, পরিণত বয়সে সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব তার নিজের সম্পর্কের আচরণেও ফুটে ওঠে। নারী ও শিশুর সুরক্ষার এই বিষয়গুলোকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই, কারণ এগুলোর মূল কারণ ও ফলাফল গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো দুটি পৃথক সমস্যা মনে হলেও বাস্তবে সহিংসতার কারণ, ধরন ও পরিণতি অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাবান ব্যক্তি অন্যের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার আছে বলে মনে করেন। বিদ্যালয় ও কমিউনিটিভিত্তিক কর্মসূচিতেও নারী ও শিশু অধিকার, নারী-পুরুষের সমতা ও ইতিবাচক আচরণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২০২৪ সালের নারী নির্যাতন জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নারীদের প্রায় ৭৬ শতাংশই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক, যৌন, মানসিক বা অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া, বিবিএস ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু জরিপের পূর্ববর্তী এক মাসে পরিবারের সদস্যদের দ্বারা শারীরিক শাস্তি কিংবা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, সহিংসতা কতটা ব্যাপক ও উদ্বেগজনক।
আমাদের সমাজে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার মূলে একই ধরনের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের পুরুষ সদস্যের কর্তৃত্বকে প্রশ্নাতীত মনে করা হয় এবং এর মাধ্যমেই ক্ষমতার অসম সম্পর্ক তৈরি হয়। যেখানে পুরুষ সঙ্গী নারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান বা মা-বাবা সন্তান শাসনের নামে সহিংসতাকে বেছে নেন, উভয় ক্ষেত্রেই একই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার দেখা যায়। এসব ঘটনাকে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক গোপনীয়তা হিসেবে দেখার সংস্কৃতিই নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বড় অন্তরায়। অনেক সময় সংসার টিকিয়ে রাখার দোহাই দিয়ে নারীকে চুপ থাকতে বলা হয়, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো সহিংসতাকে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা।
গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, যে পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহিংসতা বিদ্যমান, সেখানে শিশুদেরও নির্যাতনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। শৈশবের সহিংস অভিজ্ঞতার ফলে শিশুরা বড় হয়েও সম্পর্কের ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ক্ষতিকর ধারণা পোষণ করতে পারে। যদিও শৈশবে সহিংসতা প্রত্যক্ষ করা মানেই কেউ ভবিষ্যতে নির্যাতনকারী হবে—এমনটি নয়; যথাযথ সহায়তা, ইতিবাচক পরিবেশ ও মানসিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। তবে এটি নিশ্চিত করতে হলে পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক যোগাযোগের চর্চা বাড়াতে হবে।
নারীর প্রতি সহিংসতা কেবল বিষণ্নতা বা মানসিক ট্রমার কারণই নয়, এটি তার শারীরিক স্বাস্থ্য ও কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। গর্ভাবস্থায় সহিংসতার ঘটনা ভ্রূণের বিকাশেও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। তাই একটি সুস্থ ও অহিংস সমাজ গড়তে মা ও শিশু উভয়ের নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্যারেন্টিং শিক্ষা এবং সমতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা এই সহিংসতা রোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। সহযোগিতা বাড়ানোর অর্থ এই স্বাতন্ত্র্য বিলুপ্ত করা নয়; বরং উভয়ের শক্তি ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সহিংসতার মূল কারণগুলোর বিরুদ্ধে আরও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
সহিংসতা প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সেবাব্যবস্থায় সমন্বয় থাকা জরুরি। যখন কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে সহায়তা নিতে যান, তখন তার সন্তানদের নিরাপত্তাও একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে শিশুর ওপর নির্যাতন হলে মায়ের নিরাপত্তা ঝুঁকিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পুলিশ, সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে এই সমস্যার প্রকৃত সমাধান সম্ভব নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই সুরক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তাই সমন্বিত সেবার পাশাপাশি বয়স, নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও নিজস্ব মতামতকে সম্মান করে পৃথক সহায়তাও নিশ্চিত করা দরকার। এই লক্ষ্য অর্জনে পৃথক আইন, নীতি বা প্রকল্প যথেষ্ট নয়।
নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনগুলোর ইতিহাস ও অগ্রাধিকার ভিন্ন হলেও, সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইটা অভিন্ন। উভয় পক্ষকে আলাদাভাবে কাজ না করে অভিজ্ঞতার বিনিময় ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় এসেছে। নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। লায়লা খন্দকার, উন্নয়নকর্মী হিসেবে এই পরিবর্তনের মাধ্যমেই একটি নিরাপদ আগামীর স্বপ্ন দেখেন। সময় এসেছে পৃথকভাবে কাজ করার প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসার।

