১৩ বছর পরও বিচারহীনতার শঙ্কা, বৃদ্ধা মিনতি পালিতের প্রশ্ন
চট্টগ্রামের সিআরবিতে ১৩ বছর আগে গুলিতে নিহত হন ছেলে সাজু পালিত। সেই মামলার বিচার দেখে যেতে পারবেন কিনা, এই শঙ্কায় দিন কাটছে ৭৫ বছর বয়সী মা মিনতি পালিতের। আদালতে সাক্ষ্য দিলেও মামলার অধিকাংশ সাক্ষী হাজির না হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। আজ বুধবার এই ঘটনার ১৩ বছর পূর্ণ হলো।
২০১৩ সালের ২৪ জুন চট্টগ্রামের রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তরে (সিআরবি) এক কোটি টাকার দরপত্রের ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষে গুলিতে প্রাণ হারান ২৮ বছর বয়সী সাজু পালিত এবং আট বছর বয়সী শিশু মো. আরমান। এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার বিচার বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে চলছে। মামলার মোট ১১৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে।
বিচার নিয়ে মিনতি পালিতের হতাশা
দীর্ঘ ১৩ বছরেও বিচার শেষ না হওয়ায় নিহতদের পরিবারে গভীর হতাশা বিরাজ করছে। গতকাল মঙ্গলবার সাজু পালিতের মা মিনতি পালিত মামলার অগ্রগতি নিয়ে তাঁর হতাশা ব্যক্ত করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আর কত বছর হলে ছেলে হত্যার বিচার পাব, বিচার দেখে কি মরতে পারব না?’
আদালত সূত্র অনুযায়ী, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক অর্থবিষয়ক সহসম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী ওরফে বাবর এবং ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতা (বর্তমানে নগর যুবলীগের সদস্য) সাইফুল আলম ওরফে লিমনের অনুসারী নেতা-কর্মীদের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। এই সংঘর্ষেই যুবলীগ কর্মী সাজু পালিত ও শিশু মো. আরমান গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। বাবর প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর (আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম নগর শাখার সভাপতি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ) অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে, লিমন চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী।
মামলার তদন্ত ও অভিযোগপত্র
এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় ৮৭ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে নিহত সাজু পালিতের পরিবারের পক্ষ থেকেও আদালতে আরেকটি মামলা করা হয়। আদালত থানা মামলার সঙ্গে পারিবারিক মামলাটি যুক্ত করার নির্দেশ দেন।
মামলার তদন্ত শেষে নগর গোয়েন্দা পুলিশ ২০১৫ সালে বাবরসহ ৬২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়। তবে আদালত তা গ্রহণ না করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। পিবিআই ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাবর, লিমনসহ ৬৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তবে ঘটনায় ব্যবহৃত কোনো অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে যুবলীগের কর্মী অজিত বিশ্বাস এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি আলমগীর টিপুও রয়েছেন। আসামিরা সবাই যুবলীগ ও ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) নেতা-কর্মী।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঘটনার দিন বাবর ও লিমন—দুই পক্ষই মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, সংঘর্ষ শুরুর আগে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে পূর্বশত্রুতার জেরে অজিত বিশ্বাস সাজু পালিতকে গুলি করেন। এরপর লিমনের অনুসারীরা বাবরের অনুসারীদের দিকে এগিয়ে গেলে অজিত আবারও গুলি ছোড়েন, যে গুলিতে শিশু আরমান নিহত হয়। ২০২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তৃতীয় অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত ৬৩ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার কাজ শুরু করেন।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার স্থবিরতা
চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গত বছরের অক্টোবরে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়। এরপর থেকে এখানে ১০টি তারিখ পড়লেও একজন সাক্ষীরও সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়নি। সর্বশেষ এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই। গত ১১ মাসে একজনও সাক্ষী দেননি। গত ১৭ জুন সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ নির্ধারিত থাকলেও সেদিনও কোনো সাক্ষী হাজির হননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) এস ইউ এম নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বারবার যোগাযোগ করা হলেও সাক্ষীরা আসছেন না। ঘটনার সময় অনেকেই চট্টগ্রামে কর্মরত থাকলেও এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন। আগামী ধার্য দিনে সাক্ষীদের হাজির করতে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’
সাজু পালিতের বড় ভাই উৎপল পালিত জানান, সেদিন দুই পক্ষের উত্তেজনার সময় অজিত বিশ্বাসই তাঁর ভাইকে গুলি করেছিলেন। এই ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটেছিল, কিন্তু অজিতের অস্ত্রটি এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
শিশু আরমানের পরিবারের অবস্থা
নিহত শিশু আরমানের মা আছিয়া বেগম বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। ঘটনার সময় তিনি পরিবার নিয়ে সিআরবি এলাকার একটি কলোনিতে থাকতেন। ঘটনার পর শিশুটির পরিবার ওই এলাকা ছেড়ে চলে যায়। ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী আবু ছায়েদ জানান, বর্তমানে শিশুটির পরিবারের কেউ মামলার বিষয়ে খোঁজ নিতে আসেন না।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুস সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশব্যাপী আলোচিত এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে দরপত্র নিয়ে গোলাগুলি ও ভাগাভাগির ঘটনা আরও বাড়তে থাকবে। দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।’
